আবু রায়হান তানিন
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২২ ০৮:৪৫ এএম
আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২২ ১৯:০৮ পিএম
‘স্যার আমার ভাইর জানাজায় থাকতে পারব না স্যার। একটু খোলেন আমার ভাইটারে একটু দেখান স্যার। আমার দুইটা ভাই স্যার, আমার আরেকটা ভাই এখনো পাই নাই স্যার।’
মিরসরাইয়ে ড্রেজারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া চার শ্রমিকের লাশ তাদের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীতে পাঠানোর সময় এভাবেই বিলাপ করে নিজের ছোটভাই ইমাম মোল্লার লাশ দেখার আকুতি জানাচ্ছিলেন এনায়েত উল্লা।
ড্রেজারডুবিতে নিখোঁজ আটজনের মধ্যে দুজনই এনায়েত উল্লার ভাই। তাদের মধ্যে ইমাম মোল্লার লাশের সন্ধান পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত সন্ধান মেলেনি আরেক ভাই শাহিন মোল্লার। আগের রাতে একজন ও সকালে তিনজনের লাশ উদ্ধারের পর সব লাশ ফ্রিজারে করে ঘটনাস্থলেই রাখা হয়েছিল দিনভর।
পরিকল্পনা ছিল বাকি লাশ উদ্ধার হলে এক সঙ্গেই সব লাশ পটুয়াখালীতে স্বজনদের কাছে পাঠানো হবে। কিন্তু বাকি লাশগুলো উদ্ধারের বিষয়ে খুব একটা অগ্রগতি না হওয়ায় শেষমেশ বিকাল ৫টার দিকে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া লাশগুলো স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর এ সময়ই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
মঙ্গলবার থেকে দুই ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দুর্ঘটনাস্থলে আছেন এনায়েত উল্লা; যার এক ভাইয়ের লাশ গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে, আরেক ভাই এখনো নিখোঁজ। যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, এক ভাইকে অন্তিম বিদায় জানানোর সুযোগ তাকে ছাড়তেই হতো।
শেষ পর্যন্ত বুকে পাথর বেঁধে ইমাম মোল্লার লাশকে বিদায় দিয়ে নিখোঁজ আরেক ভাই শাহিন মোল্লার লাশের অপেক্ষা করার সিদ্ধান্তই নেন তিনি। সহোদর ইমাম মোল্লার জানাজায় থাকতে না পারার যে যন্ত্রণা, বিলাপ করে তা-ই যেন বাতাসের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চাইছিলেন এনায়েত উল্লা। শেষবারের মতো ভাইয়ের লাশ দেখার সময় বিলাপ করে এনায়েত বলছিলেন, ‘আল্লাহ, আমরা কী ক্ষতি করলাম? আমার দুইটা ভাইরে এভাবে নিয়া গেলা!‘
এদিকে ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান না পাওয়ায় ও উল্টে যাওয়া ড্রেজারটিকে সোজা করতে না পারায় উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে ক্ষোভের কথা বলছেন নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনরা। অত্যাধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই শুধু রশি আর ছোটখাটো নৌযান দিয়ে চলা উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে বিরক্তিও প্রকাশ করতে দেখা গেছে অনেককে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতার সবটুকু দিয়েই চেষ্টা করছি। মূলত ড্রেজারটি উল্টে বালিতে ডুবে গেছে। প্রতি জোয়ারে বালির স্তর অনেকটাই বাড়ছে এ কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে গেছে। আমরা বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি; তারা বলেছে তাদের উদ্ধারকারী নৌযান নারায়ণগঞ্জে আছে, আসতেই তিন দিন লেগে যাবে। এর বাইরে চট্টগ্রামের একটা বেসরকারি সংস্থার সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করেছি। তারা সন্ধ্যায় এসে রেকি করে যাবে। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। এখন ফায়ার সার্ভিস যেভাবে চেষ্টা করছে সেটাও চলমান থাকবে।‘
মিরসরাই উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৩ নম্বর বসুন্ধরা এলাকায় বেড়িবাঁধ থেকে কিছুটা দূরে সাগরে ড্রেজারটি (সৈকত-২) অবস্থান করছিল।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঝোড়ো হাওয়ায় সোমবার রাত ১০টার দিকে সেটি ডুবে যায়। এতে নিখোঁজ হন আট শ্রমিক। এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে চারজনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, বাকিরা নিখোঁজ।
উদ্ধার হওয়া চারজন হলেন—ইমাম মোল্লা, মাহমুদ মোল্লা, মো. জাহিদ বারী ও মো. আল-আমিন ফকির। নিখোঁজ চারজন—শাহিন মোল্লা, বশর হাওলাদার, আলম সরদার ও তারেক মোল্লা।
প্রবা/আরএম/জেও