প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৮:২৬ পিএম
বিধ্বস্ত মাটির ঘরের সামনে সুধির সিং ও তার ছেলে বিনয় সিং। প্রবা ফটো
‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো সবাইকে ঘরবাড়ি উপহার দিল। কিন্তু আমাদের দেখল না কেউ-ই। আমাদের চেয়েও মানবেতর জীবনযাপন করে কেউ? স্ত্রী নাই, বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে, ছয় মেয়ের মধ্যে চারজনের বিয়ে হয়েছে, দুই মেয়ে ঘরে আছে। ছেলেটাও ছোট, বয়স সবে আট বছর। অন্ধ মানুষ, শরীরে শক্তি নাই, কামকাজ নাই। বাচ্চাদের খাবার জোগান দিতে অক্ষম। অন্যের বাড়িতে চেয়ে কিংবা অনাহারেই দিন কাটে। মাটির ঘর বৃষ্টির সময় ধসে পড়েছে। খাবারই জোটে না, ঘর ঠিক করব কেমনে?’ এভাবেই নিজের দুর্দশার কথা বলেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ছত্রীপাড়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব সুধীর সিং।
সরেজমিনে দেখা যায়, ৪ শতক জায়গার চারদিকে টিন ও পলিথিন দিয়ে ঘেরা। ভেতরে বিধ্বস্ত একটি মাটির ঘর। ঘরে শুয়ে আছেন দৃষ্টিশক্তি হারানো সুধীর সিং। ঘরের পেছনের দেয়াল নেই। গত বর্ষার পানিতে ভেঙে পড়েছে। ছোট্ট জরাজীর্ণ ঘরে এলোমেলো পুরোনো কাপড়চোপড়। আর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাঁড়ি-পাতিল। নেই কোনো টিউবওয়েল কিংবা শৌচাগার।
সুধীর সিং জানান, এলাকার একটি প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়ি দেখভালের কাজ করতেন। ছিল স্ত্রী ফুলতলী সিংসহ ছয় মেয়ে ও এক ছেলে। বড় চার মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন সবার সাহায্য নিয়ে। ২০১৫ সালে হঠাৎ ওই প্রভাবশালী পরিবারটি ফুলবাড়ী থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েন তিনি। বয়সের ভারে আর কাজ জুটছিল না কোথাও। তবু এদিক-ওদিক করে চালাতেন সংসার। পরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তখন তার স্ত্রী ফুলতলী সিং অন্যের বাড়িতে কাজকর্ম করে সংসার চালাতেন। নানা রোগে ভুগে চিকিৎসার অভাবে ২০১৭ সালে মারা যান তার স্ত্রী। তখন থেকেই খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তার পরিবারের।
সুধীর সিং বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে বাড়ি করে দিল। আমাদের চেয়েও ভালো অবস্থার মানুষ বাড়ি পেয়েছে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে জোটেনি। চেয়ারম্যানকে ধরেও পাইনি বাড়ি। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ একটি বাড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়ার।’
ছেলে বিনয় সিং ও মেয়ে পূর্ণিমা সিং বলেন, ‘বাবা অক্ষম হওয়ার পর সম্বল ছিল মা, কিন্তু মাও মারা গেল। বাবার আয়রোজগার নাই। খাবারই জোটে না ঠিকমতো, বাড়ি ঠিক করবে কীভাবে? যদি সরকারিভাবে ঘর দিত তাহলে সেখানেই বসবাস করতে পারতাম।’
প্রতিবেশী মনিবালা রায়, সুমিত শীল, সাইদুল ইসলামসহ কয়েকজন বলেন, ‘অনেক দৌড়ঝাপ করেও তারা প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি পাননি। এলাকাবাসীর দাবি তাদের জন্য সরকারিভাবে একটি বাড়ি করে দেওয়া হোক। এমন মানবেতর জীবনযাপন খুব কম লোকই করে।’
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর মো. আল কামাহ তমাল বলেন, ‘যেহেতু তার নিজস্ব জায়গা আছে, তাই গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেওয়া সম্ভব না। যাদের জমি আছে ঘর নাইÑ এমন প্রকল্প এলে তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এ ছাড়া খোঁজখবর নিয়ে তাদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করছি।’