× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৬ বছর

প্রথম ধারাই পূরণ হয়নি আজও

মিলন ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি ও রিকোর্স চাকমা, রাঙামাটি

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:১৪ পিএম

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তি। প্রবা ফটো

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তি। প্রবা ফটো

দেশের পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এক ঐতিহাসিক চুক্তির। পার্বত্য শান্তি চুক্তি নামে পরিচিত এ চুক্তির ২৬ বছর পূর্ণ হলো আজ।

শান্তি চুক্তির ২৬ বছর পর প্রশ্ন হতে পারে পাহাড়ে কি আদৌ শান্তি ফিরে এসেছে? সরকারের ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। তবে পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা এখানকার আদিবাসীরা মনে করেন, চুক্তির প্রথম ধারাটি বাস্তবায়িত হয়নি আজও।

পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে স্বাক্ষর করেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, যিনি সন্তু লারমা নামেই অধিক পরিচিত।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির মূল বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম পাহাড়ি জনগণের ভূমির অধিকার, স্বনিয়ন্ত্রণ এবং তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার। সরকার বলছে, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে ৪৮টি। তবে পাহাড়ি নেতারা মনে করছেন, এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করাই ভুল ছিল। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়ি জনগণের শান্তির জন্য যে চুক্তি করা হয়েছিল, সে চুক্তির নামে পাহাড়ে বরং অশান্তিই সৃষ্টি হয়েছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে শান্তি চুক্তি হয়েছিল। শান্তি চুক্তির আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার পরিস্থিতি কেমন ছিল তা সবার জানা। চুক্তি-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে পার্বত্য জেলাগুলোয় উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। তিন জেলার মানুষ শান্তিতে বসবাস করছে।

তবে জনসংহতি সমিতির দাবি, বিগত ২৫ বছরে প্রত্যাগত পাহাড়ি শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ পরিবার তাদের ভূমি ফেরত পায়নি। তাদের গ্রাম, ভিটে-মাটি ও জায়গা-জমি সেটলার বাঙালিদের দখলে। ভূমি বিরোধ নিয়ে প্রত্যাগত পাহাড়ি ও সেটলার বাঙালিদের মধ্যে প্রায়ই উত্তেজনা দেখা দেয়। নিজের জমি ফেরত না পাওয়ায় অনেক পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করছে। 

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, চুক্তির ২৬ বছর হলেও সরকার চুক্তির মৌলিক ধারাগুলোই বাস্তবায়ন করেনি। বরং বিভিন্নভাবে প্রোপাগাণ্ডা চালাচ্ছে। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের ভোটার তালিকা প্রণয়নের কথা থাকলেও তা হয়নি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। এগুলো ছাড়া পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। চুক্তি অনুযায়ী সেনা ক্যাম্পগুলোও প্রত্যাহার করা হয়নি। সরকার বিভিন্নভাবে পাহাড়িদের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করে চুক্তি বাস্তবায়নে অজুহাত দেখাচ্ছে।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের খাগড়াছড়ি জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা বলেন, অনেকে মনে করেন আমরা শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করছি। বিষয়টা হলো আমরা অসম্পূর্ণ চুক্তির বিরোধিতা করি। ২৬ বছরেও কেন চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না? এটাই কি প্রমাণ করে না, এ চুক্তি অসম্পূর্ণ এবং চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মূল সমস্যাগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সেনা ক্যাম্প এবং অবৈধ বাঙালিদের সরিয়ে নেওয়া এবং পাহাড়িদের ভূমি ফিরিয়ে দেওয়াÑ এগুলোই তো বাস্তবায়িত হয়নি। এজন্যই আমরা এই অসম্পূর্ণ চুক্তির বিরোধিতা করি।

আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং মনে করেন, এই চুক্তির প্রথম ধারাই বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, চুক্তির ২৬ বছর অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু এর মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। এটি পাহাড়িদের জন্য হতাশার এবং দুঃখজনক। চুক্তির প্রথম ধারাই হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে আদিবাসী অধ্যুষিত। কিন্তু তারা এখন সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও প্রথম ধারাই বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তাহলে কবে বাস্তবায়ন হবে। 

তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক পরিষদ হয়েছে। পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ড, ভূমি সংস্কার বোর্ড, পার্বত্য জেলা পরিষদ হওয়ার কথা, সবই হয়েছে। এগুলোর নেতৃত্বেও আদিবাসীরাই আছেন। কিন্তু আইন ও বিধি প্রণয়ন কি হয়েছে? হয়নি। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তারা পায়নি। মূল কথা, অধিকার প্রতিষ্ঠায় যা দরকার, তা হয়নি। ভূমি সংস্কার না করে কৌশলে আদিবাসীদের ভূমি হস্তান্তর করা হচ্ছে। 

সঞ্জীব দ্রং মনে করেন, সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। এই দূরত্ব ঘোচাতে সংলাপের বিকল্প নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। 

সর্বশেষ জনশুমারিতে দেশে আদিবাসীদের সংখ্যা বলা হয়েছে মোট জনসংখ্যার শতকরা ১ ভাগ বা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত তার ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি অব আনপিপলিং অব ইন্ডিজিনাস পিপলস : দ্য কেইস অব বাংলাদেশ’ শিরোনামের এক গবেষণা গ্রন্থে বলছেন, ‘২৬ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী মানুষের অনুপাত ছিল ৭৫ শতাংশ, এখন তা ৪৭ শতাংশ। গত তিন দশক ধরে ওই অঞ্চলে আদিবাসী কমছে আর বাঙালিদের সংখ্যা বাড়ছে। পাহাড়িরা হারিয়েছে ভূমি-বনাঞ্চল আর আমদানি করা সেটলার বাঙালিরা দুর্বৃত্ত আমলা প্রশাসনের যোগসাজশে তা দখল করেছে।’

তবে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মনোভাবের বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মজিবর রহমান। তিনি বলেন, চুক্তির কিছু ধারা আছে যা বাঙালিদের জন্য কষ্টের এবং আপত্তিকর। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশেরই একটি অংশ। সংবিধানে লেখা আছে বাংলাদেশের সকল নাগরিক হবে বাঙালি। সমতলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি, বাঙালি, হিন্দু, খ্রিস্টান বসবাস করবে সম্প্রীতির বন্ধনে। কিন্তু চুক্তিতে লেখা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হবে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২৬ বছরে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারে পার্বত্য অঞ্চলে অশান্তি আরও বেড়েছে বলেও মনে করেন তিনি। মজিবর রহমান বলেন, সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ খুন-গুম বেড়েছে। সুতরাং অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার না করে পূর্ণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

পার্বত্য রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেন, ২৬ বছরেও পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়াটা অবশ্যই কষ্টের। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে, সে প্রতিবন্ধকতাগুলো যদি দূর করা না যায় তাহলে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নটা স্বাচ্ছন্দ্য গতি পাবে না। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবেই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন সহজ হবে।

তিনি আরও বলেন, শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ে উন্নয়ন কার্যক্রম বেগবান হয়েছে। পাহাড়ে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কুল-কলেজ জাতীয়করণ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ, ব্রিজ, মাইলের পর মাইল রাস্তা হয়েছে। মানুষ এখন অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে আছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা