সদরপুর-চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:২৫ পিএম
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলায় প্রায় ২৪ জন চিকিৎসক সনদপত্র ছাড়াই দাঁতের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের একজনেরও শিক্ষাগত কোনো সনদ নেই। তবু তারা দাঁতের চিকিৎসক। বাহারি নাম দিয়ে রমরমা চলছে এই অবৈধ ব্যবসা। তবে দুই-একজন দাবি করেছেন, তাদের ডেল্টাল কোর্স করা আছে।
সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের কোনো সনদ না নিয়েই নিজের ইচ্ছামতো নামের আগে চিকিৎসক আর পরে বড় বড় ডিগ্রি ব্যবহার করে দাঁতের চিকিৎসালয় খুলে বসেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা পেশার মতো একটি সুরক্ষিত পেশায় জড়িয়ে চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন তারা। এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এর আগে ভ্রাম্যমাণ আদালত কয়েকবার প্রতারণাকারী ডেন্টাল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ওই অভিযানে সদরপুর উপজেলার বিভিন্ন ডেন্টাল প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। অভিযান আতঙ্কে ডেন্টালের মালিকরা তাদের তথাকথিত চেম্বার বন্ধ করে গা-ঢাকা দেন। নামের আগে ডাক্তার লেখা মুছে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু দিন ঘুরতেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে আগের মতো দাঁতের চিকিৎসা ব্যবসা চালাচ্ছে তারা।
এর মধ্যে বিনা সনদে চলছে সদরপুর উপজেলার সদর বাজারে হালিমা ডেন্টাল কেয়ার, আদর্শ ডেন্টাল ক্লিনিক, ফাতেমা ডেন্টাল কেয়ার, সততা ডেন্টাল কেয়ার, মদিনা ডেন্টাল কেয়ার, সদরপুর ডেন্টাল কেয়ার, খান ডেন্টাল কেয়ার ও খান ডেন্টাল কেয়ারের চিকিৎসা।
এ ছাড়া সদরের বাইরের এলাকা কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মজুমদার বাজারের জাকের ডেন্টাল কেয়ার, সদরপুর ইউনিয়নের সাড়ে সাতরশি বাজারে নাজমুল মেডিকেল হলসহ প্রায় দুই ডজন ব্যক্তি দাঁতের চিকিৎসার নামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন।
সততা ডেন্টাল কেয়ারের মালিক মো. ইমরান মাহমুদ বাবুল বলেন, ‘আমি ছয় মাসের একটি ডিডিটি কোর্স করেছি। আমরা বিভিন্ন লোকজনকে ম্যানেজ করে কোনো রকমে চলি। করার কিছুই নেই ভাই।’
ফাতেমা ডেন্টাল কেয়ারের মালিক সোহেলা আফরিন স্বপ্নার নেই কোনো সনদ। তারপরও কেন ক্লিনিক খুলেছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল কোর্স করতেছি। কোর্স শেষ হতে আর এক বছর বাকি। তাই ডেন্টাল ক্লিনিক খুলেছি।’
মদিনা ডেন্টাল কেয়ারের মালিক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘সদরপুরে কোনো ডাক্তারের লাইসেন্স বা ডিগ্রি নেই। আমি ওনাদের মতো করে আমার ডিগ্রি লিখেছি। আমার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নেই। তাই নামের আগে ডিডিটি, আরএসপি যোগ করে নিয়েছি।’
হালিমা ডেন্টাল কেয়ারের মালিক হালিমা খাতুন বলেন, ‘চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল কোর্স করেছি। আমার প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র রয়েছে। অনেকে কোনো সনদ না নিয়েই যত্রতত্র ক্লিনিক গড়ে তুলেছেন।’
শৌলডুবী মজুমদার বাজারের জাকের ডেন্টাল কেয়ারের মালিক মো. শাহেদ আলী বলেন, ‘আমার কোনো সনদ নেই। তবে আমি দাঁতের ভালো চিকিৎসা করি।’
একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, দালাল ও নিজস্ব সোর্স খাটিয়ে অল্পশিক্ষিত ও অসহায় মানুষকে চিকিৎসার ফাঁদে ফেলে তাদের ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ওষুধ ও ব্যবস্থাপত্র। অনেক সময় ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম লিখা নিয়েও ভুলত্রুটি দেখা যায়। নামহীন কোম্পানির অতিরিক্ত কমিশন বাণিজ্যের জন্য রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে এসব ওষুধ লেখেন প্রতারণাকারী ডেন্টাল ক্লিনিকের নামধারী চিকিৎসকরা। মাঝেমধ্যে চিকিৎসা করাতে এসে অপচিকিৎসার বেড়াজালে আটকে যায় অনেকে। প্রতিদিন এসব ক্লিনিকে সিরিয়াল দিয়ে দাঁতের রোগী দেখছেন তারা। ডাক্তারি কোনো ডিগ্রি না থাকলেও ৫০০ টাকা ফি নিচ্ছেন এসব দাঁতের চিকিৎসক।
সরেজমিনে ক্লিনিকগুলোতে দেখা যায়, দাঁতের ফিলিং, স্কেলিং, লাইট কিউর, ফিলিং ক্যাপ, দাঁত ওঠানো, দাঁত বাঁধানোর সব কাজ কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন পদ্ধতির জন্যে রোগীদের কাছ থেকে ১ হাজার থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। তবে ডাক্তার নামে এই ব্যক্তিদের কারও চিকিৎসার সনদ নেই। চাইলেও তারা দেখাতে পারেননি।
সদরপুরের কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের যাত্রাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা হাসান আলী জানান, জাকের ডেন্টাল থেকে দাঁতের স্কেলিং করিয়েছিলেন। স্কেলিংয়ের পর থেকেই মুখে ইনফেকশন হয়। তা সারাতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। তার মতো অনেকেই এই ভুয়া চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ফরিদপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। বিষয়টি সদরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানান। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে আমি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেব।’
এ ব্যাপারে সদরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওমর ফয়সাল বলেন, এই চিকিৎসকদের বেশিরভাগেরই কোনো সনদ নেই। তাদের তালিকা করে ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান মাহমুদ রাসেল বলেন, ‘সনদপত্র ছাড়া কেউ চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে পারবে না। জানতে পেরেছি আমি এখানে আসার আগেও একাধিক ভুয়া চিকিৎসককে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের দেখার কথা। তারা কেন পদক্ষেপ নিচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। তবে ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হবে।’