গোপালগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২২ ১৬:৪৬ পিএম
আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২২ ১৯:০৮ পিএম
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ৩৫ বছর বয়সী কৃষাণী আরতী বিশ্বাস। তার স্বামী বিধান বিশ্বাসও কৃষক। সংসারে রয়েছে দুই ছেলে-মেয়ে। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে এ বছর ২ বিঘা জমিতে শীতকালীন সবজিসহ বিভিন্ন ফলের চাষ করেছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল জমিতে যেসব ফলস ফলবে তা বিক্রি করে ছেলে-মেয়ের পড়ালেখাসহ সংসারের খরচ চালাবেন। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের তান্ডবে তার সেই স্বপ্ন এখন ফিকে হতে বসেছে। এখন দিন রাত পরিশ্রম করে চেষ্টা করছেন জমির ফসল বাঁচাতে।
শুধু আরতী বিশ্বাস নয়; এমন গল্প গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া ও কাশিয়ানী উপজেলার কয়েক হাজার কৃষকের। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমান কয়েক কোটি টাকা।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সিত্রাংয়ের প্রভাবে কয়েক হাজার কৃষকের প্রায় চার হাজার হেক্টর জমির উঠতি আমন ধান, টমেটো গাছ, শীতকালীন শাক-সবজি, পেঁপে ও কালা বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘের পাড়ে লাগানো টমেটো গাছসহ অন্যান্য গাছ জমিতে হেলে পড়েছে। নষ্ঠ হয়েছে গাছে আসা ফুল ও ফল। এসব গাছে আর ফুল ও ফল না আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পেঁপে ও কলা বাগানে সব গাছ ভেঙ্গে নষ্ট হয়েছে। এসব গাছে আর ফল হবে না।
নষ্ট হওয়া এসব ক্ষেতে ফসল বুনতে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করা হয়েছে। ধার-দেনা বা নিজের জমানো টাকা খরচ করেছে তারা। ফসল নষ্ট হওয়ায় সব হারিয়ে পথে বসতে হচ্ছে তাদের। ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা কীভাবে ছেলে-মেয়ের পড়ালেখা আর সংসার খরচ চালাবেন সেই চিন্তায় পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা।
অর্থের অভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব ক্ষেতে নতুন করে ফলস লাগাতে বিপাকে পড়েছেন তারা। নতুন ফসল রোপণ করতে কৃষি বিভাগের কাছে পরামর্শসহ আর্থিক অনুদানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি, কলা ও পেঁপের চাষ করা হয়েছিল। আমন ধানের ১০ ভাগ ক্ষতি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে লতা জাতীয় সবজি এবং কলা ও পেঁপে ক্ষেতের। কৃষি বিভাগ ধারনা করছে এ ঝড়ে জেলায় ৩ হাজার ৯০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষাণী আরতী বিশ্বাস বলেন, 'নিজেদের কোন জমি নেই। পরের দুই বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেছি। কিন্তু ঘুর্ণিঝড়ের কারণে ফসল নষ্ট হয়েছে। দুই ছেলে-মেয়ে রয়েছে। মেয়ে কলেজে আর ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। পুঁজি যা ছিল চাষাবাদে খরচ করেছি। ফসল নষ্ট হবার কারণে এখন পথে বসতে হচ্ছে। সরকার যদি আমাদের কোন আর্থিক সহায়তা না করে তাহলে আমাদের আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।'
একই এলাকার কৃষক শ্যামল মালাকার বলেন, 'গত বছর লাভ হওয়ায় এ বছর সাড়ে ৬ কাঠা জমিতে টমেটোর চাষ করেছি। গাছে ফুল ও ফল এসেছে। আগাম এসব ফল তুলতে পারলে টমেটো প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি করে এক থেকে দেড় লক্ষ টাকা লাভ করতে পারতাম। কিন্তু গাছ নষ্ট হওয়ায় যে ফুল এসেছে তাতে আর ফল হবে না। এখন আমি পুরোপুরি সর্বশান্ত হয়ে গেলাম।'
কৃষক ভজন মালাকার বলেন, 'পৌনে দুই বিঘা জমি নিয়ে আমি কলাগাছের চাষ করেছি। ঝড়ের একদিন আগে জমিতে ৫ হাজার টাকার সার দিয়েছি। কিন্তু ঝড়ে আমার সব গাছ ভেঙ্গে গেছে। একটি গাছেও ফল ধরবে না। এখন আমি কাঁদবো না হাসবো বুঝে উঠতে পারছি না। যে ক্ষতি হয়েছে তা আর কোন ভাবেই পূরণ হবে না। কৃষি বিভাগ যদি আমাদের সহায়তা না করে তাহলে আমাদের মরণ ছাড়া আর কোন পথ খোলা থাকবে না।'
ফসলের ক্ষয়ক্ষতির সত্যতা নিশ্চিত করে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, 'ক্ষতির পরিমাপ জরিপ করতে আমাদের কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত আমরা ৩ হাজার ৯০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারনা করছি। এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য ইতিমধ্যে সরকারকে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ব্যাপারে কোন ধরনের ব্যবস্থা নিবে না আর্থিক প্রনোদনা দিবে তা সরকার সিদ্ধাস্ত নেবে। এরপর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে পারব।'
তিনি আরও বলেন, 'কৃষি বিভাগের সকল কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এ ক্ষতি যাতে আরও কম হয়, কৃষকরা যাতে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে সেজন্য আমরা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।'
প্রবা/আরএম/