সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৩ ১২:১৯ পিএম
আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৩ ১৮:১২ পিএম
কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় এবারও উত্তরাধিকারীদের দাপট থাকবে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অন্তত তিনটিতেই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে থেকে মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে বিশ্বাস দলটির তৃণমূল কর্মীদের। এদিকে প্রথমে কিছুটা নড়বড়ে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন পারিবারিক সূত্রে রাজনীতি করতে আসা এসব নেতা।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জ-১, ৪ ও ৬ আসনে নৌকার মনোনয়ন দৌড়ে বেশ এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্যরাই। যারা প্রত্যেকেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা। তাদের ঘিরে তেমন বিতর্ক না থাকায় স্থানীয়ভাবেও তারা বেশ গ্রহণযোগ্য। ফলে আসন তিনটিতে প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম বলে জানান একাধিক কর্মী-সমর্থক।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম। স্বাধীনতার আগে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন ও ঘনিষ্ঠজন। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন এবং প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনি নির্মম মৃত্যুর শিকার হন। তার অবর্তমানে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর) আসনে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে সেই সরকারে তিনি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। তবে মূলত তার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় ২০০৭ সালে রাজনীতির কঠিনতম সময়ে বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে। ওই সময় দলের ঐক্য ধরে রাখার জন্য প্রয়াত জিল্লুর রহমানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনি দক্ষতার পরিচয় দেন, পরবর্তী সময়ে সেই দক্ষতার কারণেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে তাকে আসীন করা হয়।
সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুর পর আসনটি থেকে তার বোন ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এবার পরিবারের মধ্যেই অন্য সদস্যরাও মনোনয়ন দৌড়ে থাকায় বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো কারণে তার মনোনয়ন নিশ্চিত না হলেও সৈয়দ পরিবারের মধ্যে থেকেই নৌকার মাঝি করা হবে বলে স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে। স্থনীয়রা জানান, সৈয়দ নজরুল এবং সৈয়দ আশরাফের বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকায় সৈয়দ পরিবারের বাইরে কাউকে ভোটাররা গ্রহণ করবে কি না, এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-অষ্টগ্রাম-মিঠামইন) আসনে টানা সাতবারের এমপি ছিলেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ উপনেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আসনটিতে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক। পরে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। পিতার রাজনীতির উত্তরাধিকারে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ আসনে প্রকৌশলী রেজওয়ান আহম্মদ তৌফিকই আওয়ামী লীগের একমাত্র প্রার্থী হচ্ছেন বলে অনেকটা নিশ্চিত মনে করছেন স্থানীয়রা।
কিশোরগঞ্জ-৬ (ভৈরব-কুলিয়ারচর) আসনের ছয়বারের এমপি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর এই আসন থেকে তার পুত্র নাজমুল হাসান পাপন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন। এই আসনটিতে তার মনোনয়ন অনেকটা নিশ্চিতই মনে করছেন তার সমর্থকরা। ইতোমধ্যে তিনি এই আসনে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন একমাত্র প্রার্থী হিসেবে। আসনটিতে আর কেউ মনোনয় ফরম তোলেননি।
রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন কিশোরগঞ্জের আওয়ামী রাজনীতি অনেকটা উত্তরাধিকারীদের ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। আগামী কয়েক দশকেও অনেকটা এই আবহে চলবে বলে তার যোগ করেন। যার ব্যতিক্রম হচ্ছে না এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও।