শরীফুজ্জামান ফাহিম, সাভার (ঢাকা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৩ ১৬:২০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনের পর থেকে চাকরি হারানোর পাশাপাশি গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন সাভারের পোশাকশ্রমিকরা। আন্দোলনের সময় অনেক কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে, তার জেরে গ্রেপ্তার করছে পুলিশ। তবে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ভয় নেই বলে পুলিশ আশ্বস্ত করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শ্রমিক আন্দোলনে কারখানা ভাঙচুর ও হামলার ঘটনায় জড়িতদের অধিকাংশই পুরুষ শ্রমিক। এক কারখানার শ্রমিকরা অন্য কারখানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হামলা চালিয়ে অনেক কারখানায় ছুটি দিতে বাধ্য করেন ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। অনেক কারখানার প্রধান ফটক ভেঙে নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর করে গাড়ি ও মালামাল ভাঙচুর করা হয়। এতে কয়েকশ কোটি টাকার ক্ষতি হয় বলে বিভিন্ন কারখানা কর্মকর্তাদের দাবি। এসব ঘটনার জেরে অজ্ঞাতনামা প্রায় চার হাজার আসামির বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা করে বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে চারটি মামলায় নাম আছে ৬১ আসামির। বাকিরা অজ্ঞাতনামা। গ্রেপ্তার হয়েছে মোট সাতজন। আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও শিল্পাঞ্চল পুলিশের সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১। কিন্তু সব তদন্ত শেষ হয়নি।
কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলায় গ্রেপ্তার আতঙ্ক রয়েছে অধিকাংশ পুরুষ শ্রমিকের মনে। হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার সময় উপস্থিত না থেকেও মামলায় আসামি হতে পারে, এমন আতঙ্কে আছে তারা। মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে গণমাধ্যমে কথা না বলতে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে অনেক কারখানার বিরুদ্ধে। কর্ম হারানো ও মামলায় আসামি হওয়ার ভয়ে অনেক শ্রমিক স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ছেন। বদলাচ্ছেন কারখানা। আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করলেও মৌখিকভাবে তাদের কাজে যোগ না দিতে বলা হয়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে কয়েকটি কারখানার বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে কয়েকশ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে বলে জানা গেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ পরিবেশ ঠিক রেখে ভাঙচুরে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেছে।
জামগড়া এলাকার একটি কারখানার সামনে সংবাদকর্মীর পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক শ্রমিক কথা বলেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর সাথে। একজন বলেন, তিনি বা তার সহকর্মীরা কেউ জড়িত ছিলেন না। তাদের চাকরি আছে, কিন্তু সবসময় গ্রেপ্তার আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে, কখন যেন পুলিশে ধরে নিয়ে যায়। কয়েকদিন ধরে এলাকার বিভিন্ন বাসায় পুলিশ গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে তারা জানান।
জামগড়া এলাকার দ্য রোজ গার্মেন্টেস কারখানার একজন শ্রমিক বলেন, ‘আমরা হামলা ও ভাঙচুরে জড়িত ছিলাম না। তবু শুনছি আমাদের সবাইকে ছাঁটাই করা হবে। চাকরি ছাড়লে যদি অজ্ঞাত মামলায় আমাদের আসামি করা হয়, সেই ভয়েও আছি।’
এএম ডিজাইন কারখানা থেকে চাকরিচ্যুত হয়েছে চায়না বেগম। সম্প্রতি কারখানা থেকে মোবাইলে তাকে চাকরিচ্যুত হওয়ার খবর দেওয়া হয়েছে বলে তার অভিযোগ। তিনি বলেন, ‘এক ছেলে ও তিন প্রতিবন্ধী ছোট বোনকে নিয়ে আমার সংসার। চাকরি হারিয়ে নিরুপায় হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।’ তিনি ফিরে পেতে চান তার হারানো চাকরি। তিনি বলেন, গত ৮ অক্টোবর কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন সুপার ভাইজারের সাথে। ১১ অক্টোবর তাকে লাইন চিফ মোবাইলে চাকরিচ্যুত করার খবর দেন। এরপর কারখানার ফটকে ঘুরে ঘুরে কারও সাক্ষাৎ পাননি বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশন আশুলিয়া কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহীম বলেন, মৌখিকভাবে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। আবার মামলার ভয় তো আছেই। আমরা বারবার দাবি করে আসছি এই আন্দোলনে ভাঙচুরের সাথে তৃতীয় কোনো পক্ষ জড়িত ছিল।
শ্রমিকরা কারখানায় ক্ষতি করেনি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু। তিনি বলেন, সরকার বেতন বৃদ্ধি প্রজ্ঞাপন জারির পর সবাই কাজে যোগ দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে মৌখিকভাবে শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে, তাতে আবারও অরাজকতা তৈরি হতে পারে। আমি অনুরোধ করব, তারা যেন এই সময়ে এমন কোনো উদ্যোগ না নেন। এখন পর্যন্ত আমরা তিনশ শ্রমিককে মৌখিকভাবে চাকরিচ্যুত করার খবর পেয়েছি।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্তি পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শাহিদুল ইসলাম বলেন, বিনা কারণে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না। আমরা চাই না কাজের পরিবেশ নষ্ট হোক। এখন পর্যন্ত ১৯টি মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করে দেখছি। যারা শ্রমিকদের উস্কে দিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে শিল্প পুলিশ-১-এর সুপার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে সেগুলো বাইরে প্রকাশ করার মতো নয়। তদন্ত চলমান রয়েছে।’