আলমগীর হোসেন, জামালপুর
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৩ ০৯:২৫ এএম
জামালপুরের ইসলামপুর পৌরশহরের ফকিরপাড়া এলাকার বংশীবাদক নিজাম উদ্দিন। প্রবা ফটো
জামালপুরের ইসলামপুর পৌরশহরের ফকিরপাড়া এলাকার বংশীবাদক নিজাম উদ্দিন। ৮০ পেরিয়েছে বয়স। মনের জোর থাকলে বয়স যে বাধা নয় নিজাম উদ্দিন তার দৃষ্টান্ত। এ বয়সেও হাল ধরে আছেন অভাব-অনটনের সংসারের। ছোটবেলায় শখের বশে বাঁশির প্রতি তৈরি হয় ঝোঁক। একসময় বাঁশিতে ওঠে সুরও। এই বাঁশির সুর নেশায় পরিণত হয় তার। তাই সেই সুরই এখন বৃদ্ধ নিজাম উদ্দিনের সংসারের একমাত্র অবলম্বন। ষাটের দশকে জামালপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বাঁশি বাজানো ও বিক্রি শুরু করেন নিজাম উদ্দিন। হাট-বাজার, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ডসহ জনবহুল স্থানে বাঁশির সুর তোলেন। সুরে মুগ্ধ হয়ে পথচারীরা যা দেন তাতেই চলে তার সংসার।
নিজাম উদ্দিন জামালপুরের ইসলামপুর পৌরসভার ফকিরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। দুই স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে বাস করছেন। অন্য ছেলেমেয়েরা যার যার সংসার করছেন। তারা মা-বাবার খোঁজখবর রাখেন না। স্থানীয়রা জানান, নিজাম উদ্দিন এই এলাকার পরিচিত মুখ। বয়স হওয়ায় তার শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ। তাই এখন আর আগের মতো বাঁশি বাজাতে দেখা যায় না তাকে।
নিজাম উদ্দিন জানান, শখ করেই এই পেশায় এসেছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঁশি বাজানোর পাশাপাশি বাঁশি বানিয়ে বিক্রি করতেন। তখন আয়রোজগারও ছিল ভালো। যৌবনের শুরুতে বিয়ে করলেও বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে পরে আরেকজন চলে আসে ঘরে। এখন আগের মতো শরীর চলে না। আয়রোজগারও তেমন নেই। তাই দুই স্ত্রী ও ছেলেমেয়ের খরচ জোগানো তার জন্য কষ্টকর। ইসলামপুর রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীদের বাঁশি বাজিয়ে শোনান। তাতে যা আয় হয় তাই দিয়ে কোনোরকম খেয়ে-পরে বেঁচে আছেন।
তিনি বলেন, ‘সরকার থেকে একটু সহায়তা পেলে বাকি জীবনটা ভালোভাবে কাটাতে পারতাম।’ নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী বুছন বেগম বলেন, ‘আগে বাঁশি বাজানোর পাশাপাশি নিজেই বাঁশি বানিয়ে বিক্রি করে ভালোই আয়রোজগার করত। এখন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতো আর বাঁশি বানাতে পারে না। তা ছাড়া এখন প্রায়ই অসুস্থ থাকায় বাঁশি বাজাতেও পারে না।’ আরেক স্ত্রী ফুলি বেগম বলেন, ‘যুবক বয়সে নিজাম উদ্দিনের বাঁশির সুর ছিল পাগল করা। তার প্রথম সংসারে স্ত্রী-সন্তান আছে জেনেও চলে আসি। কিন্তু এখন তার বয়স হয়ে গেছে। আগের সেই পাগল করা বাঁশির সুর আর নেই। এখন খুব কষ্টে আমাদের সংসার চালাতে হয়।’
জামালপুর অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কবি ও প্রাবন্ধিক জাকারিয়া জাহাঙ্গীর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বাঁশি। বিশেষত গ্রামের রাখাল বালক গাছের ছায়ায় বাঁশের বাঁশিতে মাতোয়ারা করে তুলত মাঠের কর্মব্যস্ত কৃষকদের। চিরায়ত সেই ঐতিহ্য এখন হারানোর পথে। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা যতই বাড়ুক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাঁশির প্রয়োজন হারাবে না। সেই হিসেবে নিজাম উদ্দিন এখনও বাঁশিকে ভালোবেসে মানুষকে বিনোদন দিয়ে আসছেন, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতি অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসারই নমুনা। তার এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন।’ তার প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার হাত বাড়ানো কর্তব্য বলে মনে করেন তিনি।
ইসলামপুর পৌরসভার মেয়র আব্দুল কাদের শেখ জানান, পৌরসভা থেকে নিজাম উদ্দিনকে বয়স্ক ভাতা কার্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থসহ আর্থিকভাবে তাকে সহযোগিতা করা হয়েছে। আরও কোনো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে পৌরসভা থেকে করা হবে।