হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৩ ০৯:১৯ এএম
কলাপাড়া নীলগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। প্রবা ফটো
জনবল সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যায় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মান খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে জনবল ও চিকিৎসক না থাকায় রোগীরা পাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা। ফলে গ্রাম্য চিকিৎসক বা ওষুধের দোকানদাররাই রোগীদের ভরসা। রোগীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাদের ছুটতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এদিকে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় সাত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটির ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চাকামইয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, লালুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, মিঠাগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, নীলগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, লতাচাপলী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও ধানখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ধুলাসার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভবনও আছে ঝুঁকিতে।
জরাজীর্ণ এসব ভবনেই আতঙ্ক নিয়ে সেবা দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ভবনধসের আশঙ্কায় থাকে রোগীরাও। জরাজীর্ণ এসব ক্লিনিক ৩৬ বছর আগে নির্মিত। পরবর্তী সময়ে সংস্কার না হওয়ার ফলে ভবনগুলো বর্তমানে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, উপজেলা ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আছে। পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়গুলো ছয় কক্ষবিশিষ্ট। বসবাসের জন্য কোয়ার্টারগুলোর অবস্থাও নাজুক।
সরেজমিনে নীলগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনগুলোর ছাদ ও চারপাশের দেয়ালে ফাটল ধরেছে, খসে পড়ছে পলেস্তারা। দরজা-জানালাও ভাঙা। কোনো কোনো ভবনের মেঝে দেবে গেছে। বর্ষাকালে দেয়াল ও ছাদ চুইয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। ফলে ছাদের দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা। পানি ও পয়োনিষ্কাশনেরও সুব্যবস্থা নেই। যেকোনো সময় পুরো ভবনটি ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। একই অবস্থা মিঠাগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের।
চিকিৎসাসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপন করে। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন। তবে ইউনিয়ন অনুপাতে ঘাটতি রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের। যেসব ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোয় নানা সংকটের কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আশানুরূপ সেবা পাচ্ছে না।
কলাপাড়া উপজেলাবাসীর ভরসা সাতটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। কিন্তু পদ থাকলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। সাতটি কেন্দ্রের প্রধান ১৪ পদের ৯টি পদই শূন্য। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের অধীনে এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিটিতে সৃষ্ট জনবলের পদ রয়েছে পাঁচটিÑ উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার একজন, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক একজন, ফার্মাসিস্ট একজন ও এমএলএসএস একজন ও আয়া একজন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় গর্ভবর্তী মায়েদের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তান জন্মদানের পুরোটা সময়জুড়ে চিকিৎসা নিতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন তারা। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা, পিল, কনডম, ইমপ্লাসন, আইইউডি এবং গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী অন্যান্য সেবা দেওয়া হয়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন গর্ভবর্তী মায়েরা। কেন্দ্রগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন প্রসবকালীন সেবা প্রদান করার কথা থাকলেও জনবল সংকটের কারনে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় রোগীদের এক প্রকার নিরুপায় হয়েই যেতে হচ্ছে জেলা শহরের প্রাইভেট ক্লিনিকে।
কলাপাড়ার সাতটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের শূন্য পদগুলো হলোÑ চাকামইয়া, নীলগঞ্জ, ধানখালী ও ধুলাসার, এই চার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, লালুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক, লতাচাপলী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক।
নীলগঞ্জ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক আয়শা আক্তার বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন রোগী ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ঝুঁকির্পূর্ণ ভবন। বৃষ্টির কারণে ভবনগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ছাদ থেকে বড় বড় পলেস্তারা খসে পড়ছে। কর্তৃপক্ষ এসব মেরামতের উদ্যোগ নিচ্ছে না।
লালুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ছগির হোসেন বলেন, প্রতিদিনই ভয়ে থাকি কখন মাথায় পলেস্তারা খসে পড়ে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় জরাজীর্ণ ভবনে বসে গর্ভবর্তী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছেন মজিদপুর গ্রামের আকলিমা বেগম। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখানে বড় ডাক্তার নাই। গরিব মানুষ আমি, কলাপাড়া-পটুয়াখালী যাইয়া ডাক্তার দেহাইতে অনেক টাকা খরচ হইবে। এইখানে একজন ডাক্তার থাকলে হেরে দেহাইতে পারতাম।’
উপজেলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র কর্মকর্তা ডা. মেহেদী হাসান রনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করে বেশ কয়েকবার হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কেন্দ্রগুলোয় জনবল সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জনবল সংকটের কথা জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।’