শুনতে কী পাও
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৩ ১১:২৮ এএম
ঘাঘট নদের বুকে ড্রেজার বসিয়ে দিনরাত চলে বালু উত্তোলন
রংপুরে ঘাঘট নদের ওপর চলছে অমানবিক নির্যাতন। দিনের আলোয় দেদার বালু উত্তোলন চলছে। নদের ১৬টি পয়েন্ট থেকে মাসে ৭ কোটির বেশি টাকার বালু উত্তোলন করছে বালুদস্যুরা। শত শত ট্রাক-ট্রলি সেই বালু পরিবহনে ব্যস্ত দিনরাত।
এলাকায় ড্রেজার মেশিনের শব্দদূষণও রয়েছে অতিমাত্রায়। বালু উত্তোলনের ফলে আবাদি জমি চলে যাচ্ছে নদের গর্ভে। হুমকির মুখে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও। রংপুর মহানগরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের নজিরেরহাট ভবানীপুর আবাসন এলাকার চিত্র এটি। মূল সড়ক থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার ভেতরে ঘাঘট নদে এ ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ভবানীপুর আবাসন বা গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা হয়। ৮৪টি পরিবারের প্রায় সাড়ে তিনশ সদস্য এ আবাসনে বসবাস করছে। আবাসন নির্মাণের তিন-চার মাস পর বালুদস্যুরা ঘাঘট নদের দুই ধারে বালু উত্তোলন শুরু করে। শুরুর দিকে ১০টির মতো ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হলেও বর্তমানে ১৬টি মেশিন দিয়ে উত্তোলন চলছে। আগে শুধু নদ থেকে বালু উত্তোলন করা হতো। এখন ফসলি জমি থেকেও বালু তোলা হচ্ছে। জমির মালিকদের নদী ভাঙনের ভয় দেখিয়ে স্বল্প দামে তা কিনে নিচ্ছে বালুদস্যুরা।

বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে পাইপ, ড্রেজার মেশিন জব্দ করলেও ওই দিন রাতেই মেশিন কিনে আবার বালু উত্তোলন শুরু করে বালুদস্যুরা। তারা থানা পুলিশ ম্যানেজ করে অবাধে বালু তুলছে। বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করলে মারধরের শিকার হয় এলাকাবাসী। প্রশাসনকে স্থানীয়রা একাধিকবার অবহিত করলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। প্রশাসন তৎপরতা শুরু করলে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে, এরপর আবারও চলে বালু উত্তোলন।
স্থানীয়রা জানান, ঘাঘট নদের ডান তীরে ভবানীপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে থেকে জলকরিয়া ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে বালুদুস্য বাবলা, মোখলেছ, আতাউর রহমান, আতাউর রহমানের ছেলে শাওন, মাহবুবুল, শহিদুল, মোতালেব ও রবিউলের ড্রেজার মেশিন রয়েছে। ঘাঘট নদের বাঁ তীরে বড় ময়দানের পাশে আমিনুর, সেলিম, শাবরুল, মোস্তফা, হালিম নওদার ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছে।
ভবানীপুর আবাসন প্রকল্প এলাকায় প্রতিটি পয়েন্টে প্রতিদিন ৫০ ট্রাকের বেশি বালু উত্তোলন হচ্ছে। ১৬টি পয়েন্ট থেকে ৮০০ ট্রাকের বেশি বালু উত্তোলন হচ্ছে। প্রতি ট্রাক বালুর মূল্য নিম্নে ৩ হাজার টাকা ধরা হলে দৈনিক ২৪ লাখ টাকার বালু ব্যবসা করছে দস্যুরা। মাসে ৭ কোটি ২০ লাখের বেশি টাকার ব্যবসা করছে তারা।

আবাসন প্রকল্পের অধিবাসীদের বেশিরভাগ অন্য জেলার মানুষ। নদী ভাঙনের শিকার, খেটে খাওয়া মানুষের ঠাঁই হয়েছে এখানে। স্থানীয় অধিবাসী না হওয়ায় বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালী বালুদস্যুদের হুমকি ও মারধরের শিকার হচ্ছে তারা।
স্থানীয়রা বলেন, প্রতিবাদ করতে গেলেই বালুদস্যুরা মারধর করে। ফলে ভয়ে আমরা কাউকে কিছু বলি না। প্রশাসনের লোকজন এলে বালু তোলা বন্ধ রাখে। তারা চলে গেলে আবারও চলতে থাকে।
ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘ঘাঘট নদ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে স্কুলটি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্কুলের পাশে রাস্তা দিয়ে সারা দিন বালুবাহী ট্রাক চলাচল করে। গাড়ির হর্ন ও ধুলায় আমরা অতিষ্ঠ।’
রংপুর বিভাগীয় নদীরক্ষা কমিটির সদস্য, রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘বালুদস্যুদের সঙ্গে প্রশাসনের ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলে। ঘাঘট নদ থেকে যারা বালু তুলছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব বালুখেকোদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা।’