এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৩ ১০:৩২ এএম
নেপালের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে ১০ বছর বয়সি মেয়ে অহনা রিদা জাহরা। প্রবা ফটো
অহনা রিদা জাহরা। ১০ বছর বয়সি এই বালিকা চট্টগ্রাম মহানগরীর নাসিরাবাদ সানশাইন গ্রামার স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই বয়সেই হিমালয়ের ১৩ হাজার ৫৫০ ফুট উচ্চতায় বেস ক্যাম্পে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়েছে পতপত করে। শুধু কী তাই- ধরিত্রীর বুকে যখন চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, তখন প্রায় জনমানবহীন হিমালয়জয়ের সময় ‘ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াও’ লেখা ব্যান্ড পরেছে। এই যেন ভূমণ্ডলের মালিকের আরও কাছে গিয়ে ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্ষার আকুতি জানিয়ে আসা। এর মধ্য দিয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে ট্রেকিং করার গৌরব অর্জন করল অহনা।
হিমালয়জয়ী অহনা ১০ বছর বয়সি প্রথম বালিকাÑ এটা কীভাবে নিশ্চিত হয়েছেন? এমন প্রশ্নে অহনার প্রশিক্ষক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি ২০ বছর আগে পর্বত আরোহণ-বিষয়ক সংগঠন রোপফোর প্রতিষ্ঠা করেছি। এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছি। দীর্ঘ এই সময় আমার জানামতে ১০ বছর বয়সি কোনো বাংলাদেশি বালিকা হিমালয়ের এত উচ্চতায় আরোহণ করেনি। বিষয়টি নিশ্চিত হতে আমি ইন্টারনেটেও খোঁজ করেছি। এমন কোনো তথ্য পাইনি। সে কারণে বলছি, হিমালয়জয়ী অহনা প্রথম বাংলাদেশি বালিকা।’
অহনা তার বাবা অনিকেত চৌধুরীর সঙ্গে অভিযান শুরু করে গত ৩০ অক্টোবর। ১০ জনের দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য অহনা ৩ নভেম্বর হিমালয়ের অন্নপূর্ণা অঞ্চলে ট্রেকিং করে ১৩ হাজার ৫৫০ ফুট (৪ হাজার ১৩০ মিটার) উচ্চতায় পৌঁছায়। সেখানে গিয়ে বাবার সঙ্গে বাংলাদেশি পতাকা উঁচিয়ে ধরে। এরপর বাবাসহ দলের সবার সঙ্গে ছবি তোলে।

অহনার পর্বত জয় সহজ ছিল না। নাক দিয়ে দুই দিন রক্তপাত হয়েছে। ঠান্ডায় মেয়ের নাক দিয়ে রক্তধারা প্রবাহিত দেখে বাবা অনিকেত চৌধুরী মুষড়ে পড়েছিলেন। তবে ভয় পায়নি অহনা। মানসিকভাবে শক্ত অহনা নিজেকে সামলে নিতে পেরেছে ভালোভাবেই।
অহনা ট্রেকিং সম্পর্কে প্রথম জানতে পারে বাবা অনিকেত চৌধুরীর কাছে। পরে বাবা-মেয়ে ঢাকার পর্বত আরোহণ-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান রোপফোরে যোগাযোগ করে। রোপফোরের পরামর্শে বাবা-মেয়ে শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। রোপফোর আয়োজিত একটি মৌলিক প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের ফয়’স লেকের বেস ক্যাম্প এবং সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে অবস্ট্রাকল কোর্স এবং ট্রি-টপ অ্যাক্টিভিটি চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করে।
বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ শেষ করার পর প্রশিক্ষকেরা নিশ্চিত করেন অহনা পর্বত আরোহণে যেতে পারবে। এরপর বাবা-মেয়ের পর্বতযাত্রা শুরু হয়। এই যাত্রায় ৯ জনের সদস্য এবং প্রশিক্ষক ছিলেন। বাংলাদেশ থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং কাঠমান্ডু থেকে রোপফোরের ব্যবস্থাপনায় জনপ্রতি ৩৫০ ডলার করে ফি দিয়ে সাত দিনের পর্বতযাত্রা শুরু হয় বাবা-মেয়ের। অভিযান শুরুর পঞ্চম দিনে তারা ১৩ হাজার ৫৫০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছায়।
অভিভূত অহনা
ঢাকা থেকে বাবার সঙ্গে বিমানযাত্রা শুরুর পর শিহরিত ছিল মন। অহনার কথায়, কাঠমান্ডুর কাছে বিমান পৌঁছানোর পর বরফ ঢাকা পাহাড় দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। এমন দৃশ্য নিজ চোখে দেখব কল্পনাও করিনি। আমি দলের সবার ছোট হওয়ায় আমার প্রতি সবার বাড়তি নজর ছিল। তবে কাঠমান্ডু পৌঁছে যে হোটেলে উঠলাম, সেটি খুব বেশি চিত্তাকর্ষক নয়। যা-ই হোক, কাঠমান্ডু থেকে পোখরা পর্যন্ত রাতের বাসযাত্রা ছিল আরামদায়ক। এই সময় বাবার পেটে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি। নেপালের খাবার খুব বেশি ভালো লাগেনি। তাই ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এবং চকলেট খেয়েছি বেশি।

অহনা জানায়, মূল ট্রেকিং শুরুর পর অনেক বিদেশির সঙ্গে দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। তাদের সঙ্গে ছবি তুলেছি। কিন্তু ঠান্ডা ছিল বেশি। মৌসুমের প্রথম তুষারপাত শুরু হওয়ার পর ঠাণ্ডায় পুরো দল জবুথবু। ভারী তুষারপাতের মধ্যেই আমাদের অভিযান অব্যাহত ছিল। দলের মধ্যে সবার আগে আমিই বেস ক্যাম্পে পৌঁছাই। বাবা ছিলেন দ্বিতীয়। পরে অন্যরা পৌঁছায়। বেস ক্যাম্পে পৌঁছাতে গিয়ে বাবা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আমি কিন্তু মোটেই ক্লান্ত হইনি! হিমালয়ে দিনের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ২। রাতে সেটা নামে মাইনাস ২০-এ। উফ! কী ঠান্ডা। তখন তো সবাই ডাইনিং হলে আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ সেখানে কিছুটা উষ্ণতার ব্যবস্থা ছিল। বিড়ম্বনায় পড়েছিলাম রাতের ঘুমের সময়। আমাদের রুম শেয়ার করতে হয়েছিল। এর মধ্যে নাকডাকে এমন একজন ছিলেন। এতে আমার ঘুমের সমস্যা হয়। আমি উষ্ণ কাপড়ের মোটা জ্যাকেট পরেছি। কিন্তু তাতেও যেন বরফ হয়ে যাচ্ছিলাম। ঠান্ডায় মুখ ফুলে গেছে। পর্বত থেকে আসার পথে একপর্যায়ে আমার নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু করে। রক্ত দেখে বাবা ভয় পেয়ে গেলেন। কিন্তু আমি মোটেও ভয় পাইনি। টিস্যু দিয়ে রক্ত মুছতে হয়েছে বারবার।
যেমনটা বলে অহনা, ভালো লাগার মতো অনেক কিছুই আছে পর্বতে। নয়নাভিরাম সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত কিংবা রাতের শুভ্র আকাশ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। সকালে সূর্যোদয়ের সময় সবাই ঠান্ডার মধ্যে বের হয়ে ছবি তুলছিলেন। কিন্তু আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলাম। তার পরও ছবি তুলতে বের হয়েছি বাবার সঙ্গে। ভবিষ্যতে আমি বাঞ্জি জাম্পিং করতে চাই। কিন্তু বাবা এতে রাজি না। কারণ এটা অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল। তবু আমি বাঞ্জি জাম্পিং করতে চাই। বাঞ্জি জাম্পিংয়ের বিষয়ে অহনার প্রশিক্ষক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, বাঞ্জি জাম্পের জন্য ১২ বছরের নিচে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয় না। তখন অহনা কান্না করেছিল। আমাদের দলের দুইজন বাঞ্জি জাম্প করেছেন ১০১ মিটার উঁচু থেকে।
অহনার বাবা অনিকেত চৌধুরীর উচ্ছ্বাস অন্য ধরনের। তিনি মনে করছেন, অহনা শুধু কম বয়সি হিমালয়জয়ী নয়। আরোহণের সময় সবচেয়ে কম খাওয়া আরোহীদের একজনও অহনা। কারণ সে নেপালের বেশির ভাগ খাবারই পছন্দ করেনি। এ কারণে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও চকলেটই বেশি খেয়েছে। ফলে কম খাওয়া হয়েছে তার। আর মেয়ের ইচ্ছাপূরণ করতে পারার মতো আনন্দের আর কিছু নেই বাবার কাছে। সেই হিসেবে মেয়েকে নিয়ে ১১ দিনের ট্যুরে যে সময় কাটিয়েছি সেটা নিঃসন্দেহে বাবা হিসেবে জীবনের সেরা সময়। সার্বক্ষণিক মেয়েকে দেখভাল করা, খাওয়ানো, ঘুম থেকে যথাসময়ে তোলা, হাঁটার জন্য পোশাক পরিয়ে প্রস্তুত করাÑ সবই ছিল আমার কাছে উপভোগ্য। তবে যখন বেস ক্যাম্প থেকে নেমে আসার সময় মেয়ের নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়েছিল তখন বেশ ভয় পেয়েছিলাম। এই পর্বতে মেয়ের চিকিৎসা হবে কীভাবে? তখন কিছুটা যেন অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। এই সময়টাতে আমার স্ত্রীকে বেশি মিস করেছি। কারণ মেয়ের দেখভাল আমার চেয়ে সে-ই বেশি করে।
পর্বত আরোহণের স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি বলেন, অহনা পথিমধ্যে কুকুরের সঙ্গে ছবি তুলেছে। প্রায় সব কুকুরের সঙ্গেই তার যেন পূর্বপরিচয় ছিল এমন আচরণ করছিল। একপর্যায়ে অহনা প্রশ্ন করে, এখানে বিশ্বের সব দেশের মানুষ আসে কি না। আমি বললাম, বেশির ভাগ দেশের মানুষ পর্বতে আসে। তখন অহনা প্রস্তাব করে, আমরা তাহলে সামনে যত বিদেশি নাগরিক পাব তাদের সঙ্গে কথা বলব এবং কোন দেশ থেকে এসেছে জিজ্ঞেস করব। পরে আমরা বাপ-মেয়ে সব বিদেশির সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। শেষ পর্যন্ত ৩৭ জন বিদেশির সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি। একটা জিনিস ভালো লেগেছে। ৩৭ দেশের নাগরিকেরা বাংলাদেশকে চেনে এবং আমাদের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলেছে।