জেলেপাড়ায় উৎসবের আমেজ
কক্সবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২২ ১৪:৪৬ পিএম
আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২২ ১৪:৪৯ পিএম
সাগরযাত্রায় প্রস্তুত ফিশিং বোট। ছবি: প্রবা
সাগরে ৬৫ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে শনিবার মধ্যরাত থেকে। জেলে পাড়া আবারও কর্মব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফিশিং ট্রলার নির্মাণ, মেরামত জাল বুনন থোকে শুরু করে চাল, তেল অন্যান্য মালামাল সংগ্রহে জেলে বহদ্দার, মাঝি ও শ্রমিকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রতিটি জেলেপাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ।
কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন জেলেপাড়ার জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়ে যাওয়ায় মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ায় জেলেপাড়ার বন্ধ শত শত দোকানপাট আবার খুলতে শুরু করেছে। সবার মাঝে আবার মাছ ধরতে যাওয়ার আনন্দ। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবারগুলো খুব কষ্টেদিন পার করেছেন। আগে যে স্থানে জেলে আর ক্রেতার হাঁক-ডাকে সরব থাকে, নিষেধাজ্ঞার সময় সে জায়গাটাই বিষন্নতায় ছেয়ে যায়। সাগর থেকে মাছ ধরার সব ট্রলার এবং ছোট ছোট নৌকা সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে রাখা হয় উপকূলে। মার্চ-এপ্রিলের দুই মাসের অভয়ারণ্যের নিষেধাজ্ঞা, মা-ইলিশ ধরায় অক্টোবরের দুইটি অমাবস্যা-পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালন করতে হয়। এ ছাড়া সামুদ্রিক জলসীমায় মাছের সুষ্ঠ্যু প্রজনন, উৎপাদন, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই মৎস্য আহরণের জন্য ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা থাকে ৬৫ দিনের। সব মিলিয়ে সারা বছর ১৪৭ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালন করতে হয় জেলেদের। এ সময় জেলে পল্লীতে দেখা দেয় চরম খাদ্যসংকট। এই নিষেধাজ্ঞায় বোট মালিকেরা নিজেদের ক্ষতি পুঁষিয়ে টিকে থাকতে পারলেও কর্মহীন হয়ে পড়ে শত শত দিনমজুর সাধারণ জেলে। এছাড়া অন্য কোনো কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় রুটিরুজির জন্য সমুদ্রের দিকেই থাকিয়ে থাকতে হয় এসব জেলেদের। জেলেরা জানান, বছরে ১৪৭ দিন বেকার থাকা অত্যন্ত কষ্টের। নিষেধাজ্ঞার সময়ে বেকারভাতা প্রদানের দাবি জেলে পরিবারগুলোর।
চকরিয়ার জেলে শ্রমিক আয়ুব আলী বলেন, মাছ ধরা নিষেধ থাকলে প্রতিদিন বহদ্দারদের (বোট মালিক) কাছে এসে আর দাদন নিয়ে যাই। কেউ কেউ জাল তুনে (মেরামত) সময় কাটাচ্ছে। সারা দিন জাল তুনে ২০০-৩০০ টাকা পেলেও এই টাকা দিয়ে তো আর সংসার চলে না। সাগরে নামতে পারলে দিনে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পেতাম। কিন্তু এখন যা পাই তা দিয়ে কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি।
টেকনাফের আবদুল্লাহ মাঝি বলেন, আমাদের জীবনটা পিঁপড়ার জীবনের মতো হয়ে গেছে। এক মৌসুমে আয় করে সারা বছর চলতে হয়। মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় বিভিন্ন এনজিও থেকে লোন নিয়ে ধার-দেনা করে চলতে হয়। আর যখন সাগরে নামতে পারি তখন এসব ধার-দেনা শোধ করতে হয়।
কক্সবাজার সদরের সমিতি পাড়ার আবুল কালাম বহদ্দার নামের এক ট্রলার মালিক বলেন, আমার চারটি মাছ ধরার ট্রলার আছে। সাগর থেকে তুললে প্রতিটি ট্রলারে কাজ করাতে হয়। তাই এই সময়ে তা করে নিয়েছি। এদিকে সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশের বা অঞ্চল থেকে জেলেরা বড় বড় জাহাজে করে এসে আমাদের সীমানা থেকে মাছ মেরে নিয়ে যাচ্ছে। যা আইনের চরম লংঘন বলে মনে করেন এই ফিশিং বোট মালিক।
কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, জেলার ছোট-বড় ১২ হাজার ফিশিং বোট এখন সাগর যাত্রায় যেতে প্রস্তুত। উপকূলের জেলেরা দীর্ঘদিন বসে থাকার ফলে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করেছে। তবে অনেকেই আবার সরকারের দেয়া প্রনোদনা প্যাকেজ পেয়েছেন। অনেক জেলে বহদ্দার আছেন, আড়তদার, মহাজন, ব্যাংক বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে সাগরে মাছ ধরার কাজে লাগায়। এখন দীর্ঘ সময় মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞায় এসব লোন নিয়ে বিপাকে পড়েছে ট্রলার মালিকেরা। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও কক্সবাজার সদরের শত শত বহদ্দার। চলমান ৬৫ দিনের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞায় সরকারের পক্ষ থেকে চালের সহায়তা প্রদান করা হলেও কোনো কোনো জেলের কপালে তাও জোটেনি।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ বজলুর রশিদ বলেন, চলমান নিষেধাজ্ঞায় জেলেদের জীবন নির্বাহের জন্য মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফ (চাল) বিতরণ করা হয়েছে। হয়তো কেউ কেউ বাদও পড়েছেন। অনেক জেলে শ্রমিক নিবন্ধিত না থাকায় বাদ পড়তে পারেন। এনআইডি, লাইফ জ্যাকেট, বয়া, অন্যান্য আত্মরক্ষার সরঞ্জাম ছাড়া কোন জেলে শ্রমিক যাতে মাছ ধরতে সাগরে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। আর প্রতিটি ফিশিং বোটে যাতে রেডিও থাকে এবং আবহাওয়ার সতর্ক বার্তা যাতে মেনে চলে এ বিষয়ে জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে।