ধামরাই (ঢাকা) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৯:৫৭ পিএম
আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ২০:০৩ পিএম
ধামরাই উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের সাইট্টা গ্রামে বট-পাকুড় গাছ যুগলবন্দি। প্রবা ফটো
‘এই চরে ওই হালটার কোণে বিঘে দুই ক্ষেত ভরি/ বট ও পাকুড়ে দোঁহে ঘিরে ঘিরে করি আছে জড়াজড়ি/ গায়ের লোকেরা নতুন কাপড় তেল ও সিঁদুর দিয়া/ ঢাক ঢোল পিটি গাছ দুইটির দিয়ে গেছে নাকি বিয়া।’
কবি বন্দে আলী মিয়ার ‘ময়নামতির চর’ কবিতায় উঠে এসেছে বট-পাকুড়ের নিবিড় সম্পর্কের কথা। একটা সময় গ্রামে তো বটেই শহরাঞ্চলেও দেখা মিলতো বিশাল জায়গা জুড়ে ছায়া দিচ্ছে বট কিংবা পাকুড়।
সময়ের ধারাবাহিকতায় এই দৃশ্য বর্তমানে বিরল হয়ে উঠলেও বট-পাকুড়ের এমন দারুণ যুগলবন্দি নজরে পড়ে ঢাকার ধামরাইয়ে।
লোকশ্রুতি মতে, প্রায় ৫০০ বছর আগে স্থানীয় দেবীদাস বংশের পূর্বপুরুষরা গাছ দুটি রোপন করেন। সেই সময় ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, বটগাছকে নারী আর পাকুড়কে মনে করা হতো পুরুষের রুপ হিসেবে। দাস বংশের পূর্বসুরীরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ দিয়ে ব্রাহ্মণের মাধ্যমে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করিয়ে গাছ দুটির বিয়ে দেন। সেই বিয়েতে যোগ দিয়েছিলেন বহু মানুষ।
বর্তমানে গাছ দুটির অবস্থান পাঁচ বিঘারও বেশি জায়গা জুড়ে। প্রতিদিনই দূর দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন এ যুগল গাছ দেখতে।
ধামরাইয়ের যাদবপুর ইউনিয়নের সাইট্টা গ্রামে রয়েছে এই বট ও পাকুড় গাছ। গ্রামটির গোড়াপত্তন হয় ৬০ পরিবারের বসবাসের মাধ্যমে। গ্রামের নাম ছিলো তখন ষাটটি। পরবর্তীতে ষাটটি থেকে গ্রামের নাম হয়ে যায় সাইট্টা। বর্তমানে ৪ শতাধিক মানুষের বসবাস, যার অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
৬০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা নীল কমল বলেন, আমাদের মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি গাছ দুটি স্বামী-স্ত্রী। ৫০০ বছরেরও বেশি তাদের বয়স। এক একটি শিকড়ই এখন গাছের থেকেও মোটা। এদের ডালপালা কেউ কাটে না। প্রতিদিন অনেকেই আসেন গাছ দেখতে। বৈশাখ মাসে এখানে মেলা হয়ে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবেও এখানে মানুষের সমাগম হয়।
বট-পাকুড় গাছদুটি নিয়ে আছে কিছু লোকশ্রুতি। বহু বছর একবার এই বট-পাকুড় গাছের নিচ দিয়ে ইট-ভর্তি একটি ট্রাক যাওয়ার সময় ডালের সঙ্গে আটকে যায়। ট্রাক-চালক আটকে যাওয়া ডালটি কেটে ট্রাক নিয়ে পার হয়ে যান। এরপর তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের পরামর্শে বটগাছের নিচে কয়েক কেজি বাতাসা আর মোমবাতি রেখে দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার পর তিনি সুস্থ হন।
এছাড়াও কার্তিক সরকার নামে এক কৃষকের জমিতে বটগাছের ডাল ছড়িয়ে পড়লে চাষের সমস্যা হয় বিধায় তিনি ডালটি কেটে ফেলেন। এরপর সেই কৃষকও অসুস্থ হইয়ে পরেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অনেকের পরামর্শে বটগাছের নিচে একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে পূজা-অর্চনা করতে থাকেন। তারপর থেকে স্থানীয়রা কেউ আর গাছের ডালপালা কাটেনি। বর্তমানে ডাল-পালা ও শিকড়ে ছেয়ে আছে ৫ বিঘা জায়গা জুড়ে। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে বট-পাকুড়ের নিচে থাকা মন্দিরে পূজা করেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এলাকা জুড়ে গাছটির অবস্থান। গাছ দেখতে ভিড় জমিয়েছেন অনেকেই।
নাজমুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থী জানান, অনেক শুনেছি এই গাছ দুটির কথা। তখন দেখার ইচ্ছে হয়েছিলো। আজ পরিবারসহ এসেছি গাছ দেখতে। এখানে এসে ভালো লাগছে, শান্তি অনুভূত হচ্ছে। গাছ দুটি একে অপরকে যেভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, দেখে মনে হয় সত্যিই তারা স্বামী-স্ত্রী!
কথা হয় ওয়াহিদ ইসলাম নামের দর্শনার্থীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার বাড়ি পাশের গ্রামে। মাঝেমধ্যেই এখানে ঘুরতে আসি। বড়দের কাছে শুনেছি বট-পাকুড় গাছ দুটি এবং পাশের মন্দিরটি অনেক পুরানো। এখানে আসলে মন ভাল হয়ে যায়।
ধামরাই উপজেলা বন কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন বলেন, বট-পাকুড় গাছ দেখতে অনেক পর্যটক আসে। রাস্তার সমস্যা এবং নিরাপত্তা ঘাটতি না থাকলে আরো মানুষ এখানে আসবে। গাছ দুটির চারপাশে সৌন্দর্য বর্ধণের কাজ করা হলে এই জায়গা ধামরাইয়ের মধ্যে দারুণ একটা পর্যটক কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, গাছ দুটি ধামরাইয়ের ঐতিহ্য। এই গাছকে ঘিরে ছোট একটা পর্যটন স্পট তৈরি হয়েছে। এখানে যাওয়ার রাস্তাটা কাঁচা ছিলো। এখন ইট দিয়ে রাস্তাটি উন্নত করা হয়েছে। গাছ দুটি সংরক্ষণে প্রশাসনের বিশেষ নজর আছে।