লক্ষ্মীপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৯:৫৫ পিএম
আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ২০:২৯ পিএম
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে নৌকা প্রতীকে প্রকাশ্যে ৫৭ সেকেন্ডে অন্তত ৪২টি সিল মেরে ভাইরাল হয়েছেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আজাদ হোসেন। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেই ওই উপনির্বাচনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী নৌকার প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) দাবি করেন—আজাদ হোসেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী।
আজাদ হোসেনকে পিংকু ছাত্রশিবিরের কর্মী বলে দাবি করলেও এলাকায় আজাদ শিবিরের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন—এ বিষয়ে স্থানীয়রা কেউ কিছু জানাতে পারেনি। বরং এলাকাবাসী নৌকায় প্রকাশ্যে সিল মারা আজাদকে ছাত্রলীগ নেতা বলেই জানে ও চেনে। আজাদ থানা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা।
জেলা ছাত্রলীগের একজন নেতা এবং স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আজাদ হোসেনকে শিবিরের কর্মী বললেও তারা তাদের দাবির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ বা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
আজাদ ছাত্রশিবিরের কর্মী বলে উপনির্বাচনে বিজয়ী নৌকার প্রার্থী যে দাবি করেছিলেন, তার দাবির সপক্ষে বক্তব্য জানতে তাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হয়। তবে তিনি ফোন না ধরায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
রবিবার লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৫৩ ভোটের বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন নৌকার প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু। কিন্তু এদিন নির্বাচন চলাকালেই ক্ষমতাসীনদের বল প্রয়োগ, জাল ভোট, কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ রাকিব হোসেন ও জাকের পার্টির শামছুল করিম খোকন ভোট বর্জন করেন। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন নৌকার প্রার্থী।
এরই মধ্যে পরদিন এই আসনের একটি ভোটকেন্দ্রে প্রকাশ্যে ব্যালট বইয়ের নৌকা প্রতীকে বহিষ্কৃত এক ছাত্রলীগ নেতার একাধিক সিল মারার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ওই ছাত্রলীগ নেতাকে ৫৭ সেকেন্ডে অন্তত ৪২টি সিল মারতে দেখা যায়। বিতর্কিত সেই ছাত্রলীগ নেতাই হলেন আজাদ হোসেন।
সম্প্রতি থানা ছাত্রলীগের পদ থেকে বহিষ্কার হওয়া সেই আজাদ হোসেনকেই শিবিরকর্মী বলে দাবি করেছেন উপনির্বাচনে জয়ী গোলাম ফারুক পিংকু। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে কমিশনার আনিছুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের পিংকু বলেন, ‘আজাদ ছাত্রলীগের কেউ নয়, সে শিবিরের লোক। এর আগে বিতর্কিত কাজ করেছেন, যে কারণে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিতর্কিত করার জন্য আজাদ টাকার বিনিময়ে এসব কাজ করেছে। জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এসব কাজ করা হয়েছে।’
যদিও নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পরই নৌকার এই প্রার্থীকে সশরীরে বাসায় গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আজাদ হোসেন। সিল মারা ভিডিওর মতো এই ছবিও ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবিতে গোলাম ফারুক পিংকুর গলায় আজাদকে ফুলের মালা পরিয়ে দিতে দেখা যায়।

এসব বিষয়ে জানতে গোলাম ফারুক পিংকুকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।
আজাদ হোসেন সদর উপজেলার দিঘলী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ খাগুড়িয়া গ্রামের বাচ্চু মিয়ার ছেলে। ঘটনার পর থেকে তার মোবাইল নম্বর বন্ধ রয়েছে। তিনি এলাকায় রয়েছেন বলেও কোনো সন্ধান দিতে পারেনি কেউ। ধারণা করা হচ্ছে, আতঙ্কে তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন। তার বিষয়ে স্থানীয়দের কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে চায়নি।
তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজাদকে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের রাজনীতিতে কখনও দেখা যায়নি। এলাকাবাসী জানে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিই করেন।
তাদের ভাষ্য, আজাদকে নিয়ে গোলাম ফারুক পিংকুর ‘শিবিরকর্মী’ বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি ছিল তার দায়সারা বক্তব্য। কারণ একজন শিবিরকর্মী কখনোই প্রকাশ্যে এভাবে নৌকা মার্কায় সিল মারবেন না। আর আজাদ শিবিরের কর্মী হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাকে কেন্দ্রে ঢুকতে দিতেন বলে মনে হয় না।
থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি পদ থেকে বহিষ্কার হন আজাদ
দিঘলী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আজাদ ইউনিয়ন (ছাত্রলীগ) কমিটির সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি। পরে তিনি চন্দ্রগঞ্জ থানা কমিটিতে প্রার্থী হন। থানা কমিটিতে তাকে সহসভাপতি মনোনীত করা হয়।’
জানা গেছে, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে আজাদ হোসেন সহসভাপতি নির্বাচিত হন। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে চলতি বছরের ৮ অক্টোবর জেলা ছাত্রলীগ তাকে বহিষ্কার করে।
আজাদ চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম মাসুদুর রহমান মাসুদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। আজাদকে শিবিরকর্মী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার বিষয়ে মাসুদুর রহমান বলেন, ‘দলীয় শৃৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে আজাদকে ছাত্রলীগের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আজাদ শিবিরকর্মী ছিলেন—এমন কোনো অভিযোগ ছিল না।’
প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে সিল মারার ভাইরাল ভিডিওর ব্যাপারে আজাদের বরাতে তিনি বলেন, ‘আজাদ জানিয়েছে ভিডিওটি উপনির্বাচনের নয়। তবে এখন সে ছাত্রলীগের কেউ না।’
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমার সঙ্গে অনেকেই ছবি তুলতে পারে, একসঙ্গে চলতে পারে।’
তবে আজাদ আপনার অনুসারী কি না—জানতে চাইলে সুস্পষ্ট জবাব দেননি মাসুদুর রহমান।
এ বিষয়ে চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আবু তালেব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দলের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে আজাদকে ৮ অক্টোবর বহিষ্কার করেছে জেলা ছাত্রলীগ। এখন আবার সে বিতর্কিত কাণ্ড ঘটিয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত একজন লোককে কীভাবে কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়।’
আজাদের বিরুদ্ধে শিবিরের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার কথা বলেছেন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘আজাদ উচ্ছৃঙ্খল ছিল। দলীয় নিয়মনীতি মানত না। এজন্য তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। থানা কমিটির আগে আজাদ অন্য কোনো দায়িত্বে ছিলেন কি না, তা-ও জানা নেই। তার বিরুদ্ধে শিবিরের সঙ্গে জড়িত থাকারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।’
তবে এই দাবির বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারেননি তিনি।
আজাদের ব্যাপারে দিঘলী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নুরুল আমিন বলেন, ‘আজাদের বাবা বাচ্চু আমাদের সমবয়সি। বাচ্চু বিএনপির সমর্থক, তবে কোনো পদ-পদবি নেই। আজাদ ছাত্রলীগের রাজনীতিই করত। শিবির বা ছাত্রদলের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি কখনোই শুনিনি।’
তবে আজাদ শিবির ও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত দিঘলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী জাবেদ। তিনি বলেন, ‘আজাদ শিবির ও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সে কীভাবে ছাত্রলীগের পদ পেয়েছে তা বলতে পারছি না। তার পরিচয় যাচাই করার জন্য ছাত্রলীগ থেকে কখনও আমার কাছে কেউই কিছু জানতে চায়নি। আচার-আচরণে শিবিরের সঙ্গে জড়িত থাকার ঘটনা প্রকাশ পেলে তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সে এখন কোথায় আছে তা বলতে পারছি না।’
আজাদের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহর ছাত্রশিবিরের সাবেক এক সভাপতি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব নির্বাচন আমরা সমর্থন করি না। এজন্য আমাদের কেউই নির্বাচনী কেন্দ্রের আশপাশেও যাবে না। বড় ধরনের দোষ ঢাকতে এখন ছাত্রলীগ নেতাকে শিবিরকর্মী বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’