চারঘাট (রাজশাহী) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৪:২৮ পিএম
আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৪:৩১ পিএম
খয়ের গাছ সিদ্ধ করে তৈরি করা হচ্ছে খয়েরের লালি। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
রাজশাহীর চারঘাট। খয়ের শিল্পের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত এলাকাটিতেই এখন হারাতে বসছে তার উজ্জ্বল রঙ। প্রয়োজনীয় উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, বিদেশি খয়েরের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা ও কাঁচামালের সরবরাহ কমে যাওয়াসহ নানা জটিলতায় শিল্পটি এখন ধ্বংসের পথে। বিপাকে পড়েছে এর সঙ্গে জড়িত হাজারো পরিবার।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে মুন্সী নুরুল হকের উদ্যোগে চারঘাটে খয়ের শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পঞ্চাশের দশকে ভারত থেকে আগত বিহারিদের মাধ্যমে এই শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসার ঘটে। তারা আরও জানায়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এই খয়ের শিল্পের উৎপত্তিস্থল। স্বাধীনতার পূর্বে চারঘাট থেকে লাহোর করাচিসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে রপ্তানি হতো।
খয়ের প্রধানত খাদ্য হিসেবে পানের সঙ্গে ব্যবহৃত হলেও রঙ, ওষুধ, কেমিক্যাল প্রভৃতি তৈরিতেও এর ব্যবহার হয়। যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘একাচিয়া ক্যাটেচু’। খয়ের শিল্পের কাঁচামাল খয়ের গাছ। প্রথমে খয়ের গাছের ওপরের চামড়া (ছাল) তুলে ফেলা হয়। তারপর গাছটি কুচি কুচি করে কেটে মাটির পাতিলে করে বিশেষ চুলোতে জ্বাল (ফুটিয়ে) করে রস বের করে নেওয়া হয়।
এরপর বড় ড্রামে করে রস জ্বাল করে গাঢ় করা হয়। বড় মাটির পাতিলে ঢেলে রাখলে তা জমে যায়। যাকে লালী খয়ের বা কাঁচা খয়ের বলা হয়। এই লালী খয়ের পুনরায় আগুনে জ্বাল করে। পরে একটু ঠান্ডা হলে মেশিনের সাহায্যে চাপ দিলেই তেরি হয় চার কোনা আকৃতি খয়ের। এরপর এগুলো রোদে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয় বাজারজাতের জন্য।
ব্যবসায়ীরা জানান, আশির দশক পর্যন্ত ছিল খয়ের শিল্পের সুবর্ণ সময়। সেই সময় চারঘাটের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিক থেকে নানা কারণে এই শিল্পে ধস নামতে শুরু হয়। প্রধান কাঁচামাল খয়ের গাছ বর্তমানে নেই বললেই চলে। এর মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা খয়েরের সঙ্গে করতে হয় অসম প্রতিযোগিতা। সময়ের সঙ্গে শিল্পটিতে লাগেনি আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া। বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর টাকা মোকামে বাকি পড়ে থাকায় পুঁজি সংকটেও ভুগতে হচ্ছে তাদের।
চারঘাটের খয়ের ব্যবসায়ী আব্বাস আলী শেখ জানান, তার বাবা মৃত ওমর আলী শেখ দীর্ঘ দিন থেকে এই ব্যবসা চালিয়ে এসেছেন। ফলে এখন ক্ষতি হলেও বাবার ব্যবসাটির ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। আগে বিভিন্ন এলাকায় অনেক খয়ের গাছ হতো, কিন্তু এখন এই খয়ের গাছ পাওয়া যায় না বললেই চলে।
স্থানীয়রা জানায়, মাঝে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. নুর ইসলাম ইউসুফপুর পদ্মার চরে প্রায় ২০ হাজার খয়ের গাছের চারা রোপণ করেছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে সরকারিভাবে কোনো খয়ের গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ব্যবসায়ী নাজমুল হক বলেন, সরকারি উদ্যোগে খয়ের গাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা, উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ, শিল্পের সঙ্গে জড়িত মালিক ও শ্রমিকদের কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের উচ্ছেদ করা, অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি ও বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করা এবং বিদেশি খয়ের আমদানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে চারঘাটের ঐতিহ্যবাহী খয়ের শিল্পের সুদিন আবারও ফিরে আনা যাবে। এতে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।