ফেনী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২২ ১৪:৪৯ পিএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২২ ১৫:১৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ফেনীবাসীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে। শহরের চেয়ে গ্রামের অবস্থা বেশি অসহনীয়। কয়েক সপ্তাহ আগে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের পর থেকে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। এর আগে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে গত জুলাই মাস থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু হয়।
গ্রাম এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের মাধ্যমে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তাতে সারা বছর এমনিতেই নিরবচ্ছিন্ন থাকে না। নতুন করে লোডশেডিং শুরু করার পর গ্রামে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। শহর এলাকায় রাতে লোডশেডিং কম করার চেষ্টা হলেও গ্রামে রাতে ও দিনের বেশিরভাগ সময় থাকছে না বিদ্যুৎ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চাহিদা তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে।
রুটিন (সময়সূচি) মেনে এক থেকে দুই ঘণ্টার লোডশেডিং করার কথা থাকলেও বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। রুটিনে নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কোনো ঘোষণা ছাড়াই ইচ্ছামতো যখন-তখন লোডশেডিং করা হচ্ছে। প্রতিদিন জেলার কোনো কোনো জায়গায় ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এ অবস্থায় গরমে কষ্ট পাচ্ছে মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কলকারখানায়।
সোনাগাজী পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন কাজীরহাট এলাকার ব্যবসায়ী আজিজুল্লাহ জানান, সকালে বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে বেলা ১টার দিকে। আবার বেলা ৩টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যায়, আসে দুই ঘণ্টা পর। রাতেও কয়েকবার যায়। তিনি বলেন, তার মা খুবই অসুস্থ। এর মধ্যে প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় কষ্ট আরও বেড়েছে। স্কুলপড়ুয়া মেয়েটিও ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারছে না।
বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের শিডিউলের কথা বলা হলেও শিল্পকারখানার ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্টার লাইনের (ফুড প্রোডাক্টস) পরিচালক মাইন উদ্দিনের। তিনি বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল রাখা যাচ্ছে না। কারখানা চলাকালীন বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক প্রোডাক্ট ও যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায়। লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন আগের থেকে ২০ শতাংশ কমে গেছে। তিনি আরও বলেন, চলমান অবস্থার পরিবর্তন না হলে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন করলে ব্যয় বেড়ে যায়।
সোনাগাজীর পোলট্রি ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। বিদ্যুতের অভাবে কয়েক হাজার ব্যবসায়ী লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনছেন।
সোনাগাজী পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয়ের ডিজিএম শনৎ কুমার ঘোষ বলেন, ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতে চাহিদা থাকলেও মাত্র ১২ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। এর পুরোটা সরবরাহ করা হচ্ছে উপজেলার ৮২ হাজার গ্রাহকের কাছে। তা ছাড়া ঝড়-বৃষ্টি এলে বিদ্যুৎ লাইনের বহু জায়গায় গাছপালা পড়ে। একটি বড় গাছ সরাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও চলে যায়। তখন পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ না রাখলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি আবুল কাশেম বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ব্যবসায়ে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সবার ভোগান্তির কথা চিন্তা করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবি জানান তিনি।
ফেনী পৌরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর খালেদ খান জানান, এই ওয়ার্ডে প্রতিদিন অন্তত ৪-৫ বার বিদ্যুৎ যায়। এতে বাসাবাড়ির বাসিন্দারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানায়, দিনে ৭৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৩৭ মেগাওয়াট এবং রাতে গড়ে ৪০ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া চাহিদার বা ঘাটতির বাকি বিদ্যুৎ লোডশেডিং দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে।
শিডিউল বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করে পরশুরাম পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম গোলাম রাব্বানী বলেন, সকালে (বুধবার) উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল সাড়ে ৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে আড়াই মেগাওয়াট সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে ৫০ শতাংশই লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। খুবই খারাপ অবস্থা যাচ্ছে। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক ক্রমান্বয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছানা উল্লাহ বলেন, রাত্রিকালীন চাহিদার ১৩০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৫০ থেকে ৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া দিনের বেলায় ৭৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ শতাংশ।
প্রবা/ইউরি/এমজে