মধ্যাঞ্চল প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২২ ০৮:০৪ এএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২২ ১১:৩৮ এএম
মেলামাইনের জিনিসপত্র ঝুড়িতে করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করেন এসব নারী। ছবি : প্রবা
মেলামাইনের জিনিসপত্র বিক্রি করতে ঝুড়ি মাথায় গ্রামের পর গ্রাম হাঁটেন তারা। সারা দিনের বিক্রি শেষে আবার দোকানির কাছে বিক্রীত পণ্যের অর্থ ও অবিক্রীত পণ্য বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরেন এসব অসহায় দরিদ্র নারী। সারা দিন মালামাল বিক্রি থেকেই উঠে আসে তাদের দৈনন্দিন বাজারসদাইর খরচা। এরপর রান্না-খাওয়া শেষে ঘুমাতে যান। সকাল হলেই আবার দলবেঁধে ছোটেন জীবিকার সন্ধানে।
সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য স্বামীপরিত্যক্তাসহ হতদরিদ্র এসব নারীর যেন ‘মাথার ওপর দোকানদারি’ করা প্রতিদিনের রুটিন ওয়ার্ক। আর মাথার ওপর এ দোকানের ওপর নির্ভর করেই তারা প্রায় দেড় দশক ধরে টানা এই ব্যতিক্রর্মী ব্যবসা ধরে রেখেছেন। করোনার অতিমারির সময় তাদের ব্যবসা খুব খারাপ গেলেও আবার ভালো হতে চলেছে বলে জানান একাধিক নারী ব্যবসায়ী।
সরেজমিন দেখা যায়, কিশোরগঞ্জ পৌরসভার গাইনপাড়ার বেশকিছু দরিদ্র পরিবারের নারীরা দীর্ঘদিন ধরে মেলামাইনের জিনিসপত্র মাথায় নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। সদরের হারুয়া চৌরাস্তায় ১০-১২টি মেলামাইনের দোকান রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এসব দোকান থেকে মেলামাইন পণ্য নিয়ে ঝুড়িতে সাজান ৭০-৮০ জন নারী। সাজানো শেষ হলে ঝুড়ি ও পণ্যগুলো কাপড়ে বেঁধে মাথার বিড়ায় ঝুড়ি রেখে হাঁটা শুরু করেন যার যার গন্তব্যে।
জেলার ভৈরব, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলো ছাড়াও ময়মনসিংহের নান্দাইল ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার গ্রামে গিয়েও মেলামাইনের তৈজসপত্র বিক্রি করেন এসব নারী। তবে তারা দূরে যেতে ঝুড়িতে সাজানো পণ্য ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে বহন করেন।
কথা হয় সাজেদা আক্তার, রহিমা বেগম, সরজুদা, মামণির মাসহ একাধিক নারীর সঙ্গে। তারা জানান, তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের প্রতিদিনের আয়-রোজগার ভালো না থাকায় ছেলেমেয়ে নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তারা সম্মিলিতভাবে এ জীবনযুদ্ধ শুরু করেন। কাজ করতে কোনো লজ্জা নেই।
সাজেদা জানান, বছর আট আগে টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে স্বামী সিরাজ মিয়া মারা যান। পরে বাধ্য হয়েই জীবন বাঁচাতে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। প্রতিদিন তিন ছেলে ও নিজের ভরণপোষণের জন্য মেলামাইনের তৈজসপত্র মাথায় নিয়ে নিরন্তর ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। প্রতিদিনের আয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় চলছে তার চার সদস্যের সংসার। আবার কোনো কোনো দিন বিক্রি না হলে মেলামাইনের দোকানির কাছ থেকে টাকা ধার করেন। এভাবেই চলছে সাজেদাসহ ৭০-৮০ জন দরিদ্র নারীর সংসার।
স্বামীপরিত্যক্তা একাধিক নারী ক্ষোভের সঙ্গে জানান, কয়েক বছর ধরে বিধবা ভাতার কার্ড পাচ্ছেন না তারা।
একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে শারমিন আক্তার বলেন, ‘বিধবা ভাতার কাড (কার্ড) কেমনে পামু! আমরার তো ট্যাহা (টাকা) নাই। ট্যাহা থাকলে কার্ড মিলে। যারা কাড পাইছে তারা হগলেই (সবাই) বড়লোক।’ এমনই ক্ষোভ প্রকাশ করেন হালিমা আক্তার, মরিয়ম আক্তার, বিলকিছ বেগম ও রোকেয়া বেগম।
সরজুদা জানান, পাঁচ সদস্যের সংসার নিয়ে স্বামী ঠেলাগাড়ি চালক হাসিম মিয়া হিমশিম খেতেন। তিন বেলা সন্তানদের খাবার দিতে পারতেন না। পরে তিনি সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে এ ব্যবসায় নেমে পড়েন। এখন দুজনের আয়-রোজগারে তিন বেলা খাবারের পাশাপাশি দুই সন্তানকে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছেন। সন্তানদের সবাইকে উচ্চশিক্ষা দেবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মেলামাইনের জিনিসপত্র ঝুড়িতে করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করেন এই নারী। ছবি : প্রবা
চৌরাস্তায় মেলামাইন দোকানের মালিক সঞ্জয় দত্ত বলেন, ‘আমার দোকান থেকে ১০ জন নারী তৈজসপত্র নিয়ে বিক্রি করেন। প্রতিদিন ৫-৬ হাজার টাকার পণ্য দিই। তারা সেগুলো বিক্রি করে আমাকে টাকা বুঝিয়ে দেন এবং আমিও তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিই।’
আরেক মালিক শ্যামল মিয়া বলেন, ‘এসব নারী থাকায় আমাদের কর্মচারী রাখার দরকার পড়ে না। তাই আমরা কোনো কর্মচারী রাখি না।’
একই কথা বলেন আরেক দোকানদার কালু মিয়া, ‘মালামাল দিই । বিক্রির পর সবাই টাকা ও মালামাল বুঝিয়ে দেন। তাদের মধ্যে কোনো ফাঁকি বা বাটপাড়ি নেই। তাই তাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা বেশ ভালো চলছে।’
প্রবা/এইচকে/জেও