র্যাবের ব্রিফিং
কক্সবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:৩৬ পিএম
আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:৩৬ পিএম
রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরসার দুই শীর্ষ কমান্ডার। বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালায় র্যাব। প্রবা ফটো
কক্সবাজারে একাধিক ক্যাম্পে বর্তমানে আশ্রিত আছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার বাস্তচ্যুত এসব রোহিঙ্গার অনেকে নিজ দেশে ফিরতে চায়। তাদের আশ্রয়ণ এলাকা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ (আরসা) একাধিক ‘নিরাপদ’ আস্তানা গড়ে তুলেছে বলে জানিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এলিট ফোর্সটির দাবি, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে আরসার একাধিক টর্চার সেল রয়েছে। প্রত্যাবাসনে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করতে এগুলো তৈরি করেছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি। বিচারের নামে তারা অনেক রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতাসহ সাধারণ রোহিঙ্গাদের সেখানে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালায়। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে অপহরণ, মুক্তিপণসহ নানা অপরাধের নিরাপদ আস্তানাও এসব টর্চার সেল।
উখিয়ার কুতুপালং এলাকার মধুরছড়া পাহাড়ের গহিনে এমন একটি টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে র্যাব। শুক্রবার (২৭ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। কক্সবাজারে র্যাব-১৫-এর কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
র্যাব জানায়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কুতুপালং এলাকার ওই টর্চার সেলে অভিযান চালিয়ে আরসার দুই শীর্ষ কমান্ডারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও আরও কিছু সরঞ্জাম। গ্রেপ্তাররা হলেন, ১৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মৃত নুরুজ্জামানের ছেলে মো. ওসমান ওফফে সালমান মুরব্বী ও ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সৈয়দ হোসেনের ছেলে মো. ইউনুস। তাদের আইনগত প্রক্রিয়ার জন্য উখিয়া থানায় সোপর্দ করা হবে।
র্যাব জানায়, সালমান আরসার শীর্ষ কমান্ডার। তিনি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির ওলামা বডি ও টর্চার সেলগুলোর প্রধান। সালমান দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তাকে হত্যা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত। আর ইউনুস সন্ধানপ্রাপ্ত টর্চার সেলটির নিয়ন্ত্রক ও সালমানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত কমান্ডার।
অভিযানে উদ্ধার হয়েছে একটি ৯-এমএম বিদেশি পিস্তল ও পিস্তলের চার রাউন্ড গুলি, চারটি একনলা ওয়ান শুটার গান, দুটি এলজি, পাঁচ রাউন্ড ১২ বোর কার্তুজ, একটি কুড়াল, তিনটি বিভিন্ন সাইজের প্লাস, একটি কাঠের লাঠি, একটি স্টিলের লাঠি, একটি করাত, একটি চাকু, একটি লোহার রড, একটি লোহার দা, একটি হ্যাংগিং হুক, একটি সিসর, চারটি তালা, তিনটি বড় লোহার পেরেক, দুটি লোহার শিকল, একটি রশি, একটি কুপি বাতি এবং সুইসহ সুতার একটি বান্ডেল।
র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুন, অপহরণ, ডাকাতি, মাদক, চাঁদাবাজি করে আসছে আরসা। এ ছাড়া ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকেন্দ্রিক কোন্দলসহ বিভিন্ন অপরাধের ওপর দীর্ঘদিন নজর রাখছিল র্যাব। এখন পর্যন্ত আরসার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও সামরিক কমান্ডার, গান কমান্ডার, অর্থ সম্পাদক, আরসা প্রধান আতাউল্লাহর একান্ত সহকারী, অর্থ সমন্বয়কসহ ৭৩ জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্ত্রসী গোষ্ঠীটির শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ অন্যান্য সদস্যদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবারের অভিযান প্রসঙ্গে আল মঈন বলেন, প্রথমে সালমানকে ৪ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে মধুরছড়ার পাহাড়ের গহিনে টর্চার সেলটির সন্ধান জানায়। সেখান থেকে ইউনুসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পর অস্ত্র, গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, সালমান ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আসে। এরপর সে থাইংখালীর ১৩ নম্বর ক্যাম্পে বসবাস শুরু করে। ২০১৮ সালে সে আরসায় যোগ দেয়। এজন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির ওলামা কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য ও কমান্ডার মৌলভী মোস্তাক আহম্মদ ও মৌলভী আবু রায়হানের সঙ্গে দেখা করে সালমান। পরে অস্ত্র চালনাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নানা দায়িত্ব পালন করে সে। বর্তমানে আরসার ওলামা শাখার প্রধান হিসেবে নেতৃত্বে আছে সালমান। তার নির্দেশনায় মৌলভী লাল মোহাম্মদের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি গ্রুপ তৈরি করা হয়। যারা মুলত রোহিঙ্গা তরুণ, যুবকসহ সাধারণ রোহিঙ্গাদের প্রলোভন দেখিয়ে ও জোরপূর্বক আরসায় যোগদান করায়।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির দুই শীর্ষ কমান্ডারকে গ্রেপ্তারের পর তাদের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য উল্লেখ করে আল মঈন বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন করতে টর্চার সেল স্থাপনের পরিকল্পনা করে আরসা। এর দায়িত্ব পায় সালমান। পরিকল্পনা অনুযায়ী আরসাপ্রধান আতাউল্লাহর নির্দেশে ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতর, ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড় ও গহিন জঙ্গলে একাধিক টর্চার সেল বানানো হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে এসব টর্চার সেল পরিচালনা করে আসছে আরসা। সালমানের নেতৃত্বে মাস্টার কামাল, মাস্টার ইউনুছ, জাফর আলম, মৌলভী যুবায়ের, মাস্টার আবুল হাশিম, মাস্টার সলিমসহ আরসার একাধিক কমান্ডার এসব টর্সাল সেল পরিচালনা করে। এগুলো খুঁজে বের করতে অনুসন্ধান শুরু করেছে র্যাব।