গাইবান্ধা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৩ ১৮:০৬ পিএম
আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৩ ১৮:২২ পিএম
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সরকারি রাস্তা জবরদখলের অভিযোগ উঠেছে উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে- রেকর্ডভুক্ত সরকারি রাস্তা দখল করে ইউনিয়ন পরিষদের প্রাচীর নির্মাণ করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, রাস্তার জন্য রেকর্ডভুক্ত সরকারি জায়গা বাদ দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন ঈদগাহ মাঠের জায়গা দখল করে পাকা রাস্তা নির্মাণের জন্য রাস্তা খনন ও গাছ কাটারও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
তবে এসব অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেছেন চেয়ারম্যান। অপরদিকে এ বিষয়ে শিগগির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির উত্তর পাশে ঈদগাহ মাঠ। মাঠের পূর্ব দিকে ১২ নম্বর কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ। মাঠের পূর্বদিক ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রাচীর ঘেঁষে পাকা করার জন্য খনন করে রাখা হয়েছে আনুমানিক ১০০ মিটার রাস্তা। যার উভয় দিকেই রয়েছে পাকা সড়ক। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে পড়ে আছে কেটে ফেলা একটি গাব গাছ।
গতকাল মঙ্গলবার ঈদগাহ মাঠে চেয়ারম্যানের ‘জোরপূর্বক পদক্ষেপের’ বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে ঈদগাহ মাঠ কমিটি; যেখানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক শ মানুষ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম ইউনিয়ন পরিষদের লেবার দিয়ে ঈদগাহ মাঠের জায়গায় রাস্তা খনন করেছেন, যেটা বেআইনি। তিনি রাস্তার রেকর্ডভুক্ত জায়গা দখল করে ইউনিয়ন পরিষদের প্রাচীর নির্মাণ করেছেন। মানববন্ধন শেষে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলও করেন তারা।
ঈদগাহ মাঠ কমিটির সেক্রেটারি শাহ রেজাউল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাঠের ভিতর দিয়ে রাস্তা না করে রাস্তার জন্য রেকর্ডভুক্ত জায়গা দিয়ে রাস্তা করতে এলজিইডি ও প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সম্প্রতি অভিযোগ করা হয়েছিল। অভিযোগের প্রেক্ষিতে চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম সরকার কর্তৃক ঈদগাহ মাঠের যায়গা দখলের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। অবিলম্বে ঈদগাহ মাঠের যায়গা বাদ দিয়ে রেকর্ডভুক্ত জায়গা দিয়ে পাকা রাস্তা করার দাবি জানাই।’ একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঈদগাহ মাঠের গাছ কেটে নেওয়ার বিষয়ে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি করেন তিনি।

জানা গেছে, এসব অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের ২০ আগস্ট ঈদগাহ মাঠ কমিটির পক্ষে উপজেলা প্রশানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. খাদেম হোসেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবনসংলগ্ন মাঠটি প্রাচীণকাল থেকেই ঈদগাহ মাঠ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক সরকারি রেকর্ডকৃত রাস্তাটি প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ায় জনসাধারণকে ঈদগাহ মাঠের ওপর দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সম্প্রতি তিস্তা সেতু সংযোগ সড়ক (এলজিইডি কর্তৃক) নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করায় এই রাস্তাটিও পাকাকরণের জন্য নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ। এরপর সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার, নকশাকারক ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সরেজমিন পরিদর্শনে আসলে দেখা যায়, ইউপি কমপ্লেক্স ভবনের সামনের মাঠ থেকে চার শতক ও ঈদগাহ মাঠ থেকে আধা শতক জমি হুকুম দখল করে রাস্তাটি পাকা করণের জন্য নির্ধারণ করা, যা লাল চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কিন্তু কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম সরকার জোড়পূর্বক ঈদগাহ মাঠের ওপর দিয়ে সম্পূর্ণ রাস্তাটি পাকাকরণের জন্য ঠিকাদার দিয়ে মাটি খননের কাজ শুরু করে। পরে ঈদগাহ মাঠ কমিটি, স্থানীয়রা এলজিইডির নির্ধারণ করা জায়াগা দিয়ে রাস্তা নির্মাণের দাবি জানিয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দ্বারস্থ হয়। পরে উপজেলা চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে গেলেও ইউপি চেয়ারম্যানের অসহযোগিতার কারণে তা সমাধান সম্ভব হয়নি।
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম সরকার চলতি বছরের ১৯ আগস্ট ওই রেকর্ডকৃত রাস্তায় অবস্থিত একটি বড় গাব গাছ কোনোরকম টেন্ডার বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কেটে বিক্রি করে দেন।
পরে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি আমলে নিয়ে সুন্দরগঞ্জ ভূমি কর্মকর্তাকে (এ্যসিল্যান্ড) তদন্তের নির্দেশ দেয়। গেল ১২ অক্টোবর উপজেলা প্রশাসনের কাছে তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পরিষদের জমির দাগ সমূহ সরকারি সার্ভেয়ার ও স্থানীয় সার্ভেয়ারের যৌথ পরিমাপে দেখা যায় যে, বর্তমানে চলাচলের জন্য রাস্তাটি ফাঁড়ি থানার হুকুম দখলকৃত জমি ও ঈদগাহ মাঠের জমির ওপর অবস্থিত। কিন্তু মৌজা ম্যাপ ও পরিমাপ অনুযায়ী রাস্তার প্রকৃত অবস্থান ৩৮২১ নম্বর দাগের ব্যক্তিবর্গ ও ইউনিয়ন পরিষদ জবরদখলে রেখেছে। মৌজা ম্যাপ অনুযায়ী, ৯১৩০ নম্বর দাগের রাস্তার জমি ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন রাস্তার অংশটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জবরদখল করে প্রাচীর দিয়ে রেখেছেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের পশ্চিম-উত্তর কোণে রাস্তার উপর একটি গাব গাছ চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম সরকার কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কেটে ফেলেছেন, যা ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে রক্ষিত আছে। প্রকৃত রাস্তাটি ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক জবরদখল হওয়ায় জনগণ বাধ্য হয়ে ঈদগাহ মাঠের উপর দিয়ে চলাচল করছে।
একইসঙ্গে প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

লিখিত অভিযোগকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা খাদেম হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে হওয়া তদন্তে বিষয়গুলো প্রমাণিত হয়েছে। তারপরেও চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম কীভাবে পরিষদের লেবার দিয়ে জোরপূবর্ক ঈদগাহ মাঠের যায়গায় রাস্তা খনন করেন, বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়। এত কিছুর পরেও প্রশাসন নীরব কেন?’
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী শামসুল আরেফীন খান বলেন, ‘যেহেতু রাস্তার ওই অংশটি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে, ওখানে আমরা কাজ করিনি, ওই অংশে আমরা কোনো খননও করিনি।’
গাছ কাটার বিষয়ে উপজেলা বন বিভাগ কর্মকর্তা খন্দকার মেহেদি হাসান বলেন, ‘গাছটি কাটার আগে আমাদেরকে অবগত করা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরণের কোনো গাছ কাটার প্রয়োজন হলে এর কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা মূল্য নির্ধারণের জন্য আমাদেরকে (বন বিভাগ) অবগত করবেন। বন বিভাগের মূল্য নির্ধারণের পর স্থানীয় প্রশাসন কমিটি গঠন করবে এবং এরপর টেন্ডার বা ডাকের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে। এ গাছটির ক্ষেত্রে তা হয়নি।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি কোনো সরকারি রাস্তা দখল করি নাই, রাস্তাও করিনাই। এলজিইডি রাস্তা করেছে, সেই রাস্তায় চলছে।’
পরিষদের শ্রমিক দিয়ে ঈদগাহ মাঠের যায়গায় রাস্তা খননের বিষয়ে বলেন, ‘আমি কেন করব? আমিতো ঠিকাদার নই। ঠিকাদার লেবার দিয়ে করেছে।’
গাছ কাটা প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ‘আমি কোনো গাছ কাটিনি। রাস্তার কাজের সময় এলজিইডি ভেকু দিয়ে পরিষদের প্রাচীর ভেঙে দিয়েছে এবং মাটি গভীর খনন করায় গাছটি উপড়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তখন নিরাপত্তার জন্য গাছটি পরিষদ কাটে, তা রক্ষিত আছে।’
এসময় উপজেলা প্রশাসনের কাছে ভূমি কর্মকর্তার দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন ‘ঠিক নয়’ দাবি করে বিষয়টি পুনরায় তদন্তের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এসব বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুঠোফোনে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দ্রুতই এসব ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কেউ যদি আইন লঙ্ঘন করে থাকে, তবে সেটির আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’