আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৩ ১০:৩৩ এএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:৩৯ পিএম
দুর্গাপূজায় ঢাকিদের কদর বাড়ায় ঢাকঢোল মেরামতে ব্যস্ত কারিগর সুজন দাশ। প্রবা ফটো
আরতির সময় ঢাক-কাঁসা বাজানো পূজার আচারেরই একটি অংশ। তবে গত কয়েক বছর হাল আমলের ডিজে গানের রমরমায় অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছিল ঢাকের বাজনা। পূজার সাত্ত্বিকতার ক্ষেত্রে ডিজে সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সে চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। এতে আবারও ঢাকিদের সুদিন ফেরার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গত দুই বছর ধরে আবার মণ্ডপগুলোতে ঢাকের বাজনা ফিরতে আরম্ভ করেছে। এর ফলে ব্যস্ততা বেড়েছে ঢাক, ঢোল সংশ্লিষ্ট মানুষদেরও।
তবে যুগের চাহিদার কারণে ঢাক-কাঁসার বাজনার সঙ্গে যোগ করতে হচ্ছে কিবোর্ড, মার্গিজ, বাঁশিসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। এর ফলে খরচ বাড়ছে। তবে ঢাকিদের ভাগ্য খুব একটা পরিবর্তন হচ্ছে না। বছর চারেক আগে ঢাক বাজিয়ে যে রোজগার ছিল তার চেয়ে বর্তমানে আয় বাড়েনি একটুও। ফলে ঢাকিদের সুদিন যেন ফিরেও ফিরছে না।
চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের ভগবান বণিকের বাড়ির পুজোয় এবার দীর্ঘ সাত বছর পর ঢাকিদের ডাকা হয়েছে। ওই মণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক বাবু নরোত্তম বণিক বলেন, ‘ছয়-সাত বছর আগে আমরা ঢাক বন্ধ করে দিই। শেষবার ৩৫ হাজার টাকায় ঢাকিদের বায়না করতে হতো। খরচের একটা বড় অংশ ছিল এটা। এজন্য খরচ কমাতে বন্ধ করেছি। তবে এবার ছেলেরা বলছে ঢাক ছাড়া চলবে না। তাই ছয় বছর পর আবার ঢাকিদের ডাকতে হলো। এবার ৬৫ হাজার টাকায় চুক্তি করেছি। খরচ অনেক বেড়েছে।’
তবে খরচ বাড়লেও ঢাকিরা বলছেন, খুব একটা লাভ হচ্ছে না তাদের। নগরীর নিউমার্কেট এলাকায় কথা হয় ঢাকি জুয়েল দাসের সঙ্গে। এবারের পুজোয় আনোয়ারা উপজেলার একটা মণ্ডপের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে তার। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ির এলাকায় চুক্তি করেছি। তাই কম দামেই নিতে হয়েছে। ৬০ হাজার টাকার চুক্তি। কিন্তু যুগের চাহিদা অনুযায়ী বাদ্যযন্ত্র বাড়াতে হচ্ছে। এ কারণে কারও ভাগে খুব বেশি টাকা পড়বে না। তবু দিন শেষে মানুষ সাত্ত্বিক পূজায় আগ্রহী হচ্ছে এটা ভালো লাগছে। লাভ না হলেও এটা একটা প্রাপ্তি।’
টিংকু দাশ নামে আরেক ঢাকি জানান, এবারের পূজায় কোনো বায়না নেননি তিনি। কারণ যে টাকায় চুক্তি হচ্ছে তা দিয়ে খুব বেশি লাভ থাকবে না তার। টিংকু দাশের মতো অনেক ঢাকিই তাদের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাই হারানো সুদিন এখনও ফেরেনি বলেই মনে করেন অনেকে। সাধারণত সংগীত যন্ত্রের দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে ঢাকি দলগুলো গড়ে ওঠে। এসব দোকান থেকে চুক্তি হয়। তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান আকাশ ব্যান্ড দল। চার বছর আগেও এই দলে ২৭ জন ঢাকি ছিলেন। বর্তমানে এই সংখ্যা মাত্র ১৩ জন। বাকিদের কেউ মারা গেছেন, কেউ ছেড়ে দিয়েছেন। আকাশ ব্যান্ড দলের ম্যানেজার ইব্রাহীম খলীল বলেন, ‘চার বছর আগে ২৭ জন ঢাকিরই চুক্তি ছিল পূজাতে। মাঝের বছরগুলো একদম শূন্য হয়ে যায়। এবারে মাত্র একটা চুক্তি হয়েছে। এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকায়। আশা করছি আরও দুয়েকটা পাব।’
নগরীর পাথরঘাটা এলাকার আরেকটি দোকান তাল বিতানে কথা হয় সুজন দাশের সঙ্গে। ৫০ বছরের পুরোনো দোকান এটি। ঢোল তবলা মেরামত ও বিক্রি করেন তারা। সুজন দাস বলেন, ‘এই বছর ঢোল বিক্রি ও মেরামত দুটোই বেড়েছে। এখন পর্যন্ত ৩০টির মতো ঢোল মেরামতের কাজ করেছি। নতুন বিক্রি করেছি ১০টির মতো। গত কয়েক বছরের তুলনায় কিছুটা ভালো অবস্থা।’
এমন পরিবর্তনে খুশি সাধারণ মানুষও। তেমনই একজন লিপটন দেবনাথ দেবু। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ডিজের আধিক্যে ঢাকিদের অবস্থা অনেক খারাপ ছিল। সাধারণত জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন এ কাজটা করে। তাদের অনেকে ঢাক বাজানো ছেড়েও দিচ্ছিলেন। অথচ এটি পূজার সাত্ত্বিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এবার পরিবর্তন দেখে ভালো লাগছে। সাত্ত্বিকতা ফেরার আনন্দ হচ্ছে।’
পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল সেন উজ্জ্বল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডিজে আমাদের পূজার কোনো অংশ নয়, বরং অপসংস্কৃতি। অনেকে না বুঝে মণ্ডপে মণ্ডপে ডিজে লাগিয়ে দেন। এগুলো নিয়ে অনেক আলোচনাও হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে সিরিয়াস ছিলাম। পূজার সাত্ত্বিকতার স্বার্থে আমরা ঢাকিদের পৃষ্ঠপোষকতা করার চেষ্টা করেছি। ডিজে করায় নিরুৎসাহিত করেছি। এখন অনেকে আবার ঢাকিদের কাছে ফিরছে। তবে ঢাকিরা অনেকে পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। আবার যারা মারা যাচ্ছেন তাদের ছেলেরা বাবাদের পেশায় আসছেন না। এসব কারণে সমস্যা হচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তাদের সুবিধা হতো।’