ফেনী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:০২ পিএম
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৩ ১৪:০৩ পিএম
ফেনীতে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রবা ফটো
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা সামনে রেখে ফেনীতে চলছে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ। মাটির কাজ শেষে এখন রঙতুলির আঁচড়ে মূর্ত হয়ে উঠছে দেবীর রূপ। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ২০ অক্টোবর শুরু হবে পূজা। জেলার ১৪৭টি মণ্ডপে এবার দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে। মণ্ডপগুলোতে চলছে প্রতিমা তৈরি ও শেষ সময়ের সাজসজ্জা। শিল্পীরা প্রতিমার গায়ে শেষ তুলির আঁচড় টানতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্যই স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে দেবী দুর্গার আগমন ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর শারদীয় উৎসব হিসেবে দুর্গাপূজা উদযাপন করে আসছে। দুর্গাপূজার প্রধান অনুষঙ্গ দেবী দুর্গার প্রতিমা। উৎসব সামনে রেখে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় মাটির প্রতিমা হয়ে উঠছে অপরূপ। একই সঙ্গে দুর্গোৎসবকে পরিপূর্ণ করতে দিনরাত মন্দিরগুলোতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
শহরের কয়েকটি মণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, কাদামাটি, বাঁশ, খড়, সুতলি দিয়ে শৈল্পিক ছোঁয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। দম ফেলার সময় নেই কারিগরদের। সুনিপুণ হাতে মাটি ও রঙতুলির ছোঁয়ায় দেবীকে রাঙিয়ে তুলতে ব্যস্ত শিল্পীরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছেন তারা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কারিগররা প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, অসুরসহ বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি।
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এবারের দুর্গাপূজা ২০ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজা দিয়ে শুরু হবে। দশমী শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ২৫ অক্টোবর উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। এর আগে পঞ্চমী থেকেই শুরু হয়ে যায় উৎসবের আমেজ। সরেজমিন দেখা গেছে, শহরের কালীমন্দিরে দুর্গার বাহকসহ প্রতিমার শাড়ি ও অলংকার পরানোর কাজ চলছে। আলোকসজ্জা ও রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। প্রতিমা দেখতে এখনই দর্শনার্থীরা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শিল্পীরা জানান, প্রতিবছরই তারা অধীর আগ্রহে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজের অপেক্ষায় থাকেন। শুধু জীবিকার জন্যই নয়, দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি, ভক্তি আর ভালোবাসা। মা দুর্গাকে মায়ের মতোই তৈরি করা হচ্ছে।
ফেনীর গুরুচক্র মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত দেখা গেছে শিল্পী কানাই পালকে। তিনি জানান, এবার ১৮টি মণ্ডপে প্রতিমা তৈরি করেছেন। মাটি, বাঁশ, খড় ও কারিগরের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না। কানাই পাল ছাড়াও শিল্পী সুশীল পাল, মধুপাল ও শ্রীচরণ পালসহ ২০-২৫ জন কারিগর প্রতিমা তৈরি করছেন সেখানে।
সুশীল পাল বলেন, ‘এখনই বছরের সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করছি। পূজা শুরুর আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। দম ফেলার সময় নেই। এর মধ্যেই দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির সব কাজ শেষ করতে হবে।’ কাজ শেষে বিশ্রামের ফাঁকে প্রতিমা শিল্পী মধুপাল বলেন, ‘যত কষ্টই করি না কেন, যখন দেবীকে তার স্বরূপে মণ্ডপে বসানো হবে, তখন সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে যখন আমাদের তৈরি প্রতিমাকে সবাই পূজা করে। তখন নিজেকে সফল, সার্থক মনে হয়।’
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, জেলা সদরে ৪৬টি, পৌরসভায় ১২, সোনাগাজী উপজেলায় ২৩, দাগনভূঞায় ১৯, ফুলগাজীতে ৩৫, পরশুরামে ৫, ছাগলনাইয়ায় ৭টি মণ্ডপে পূজা উদযাপিত হবে। পূজাকে কেন্দ্র করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জনপ্রতিনিধি, পূজা উদযাপন কমিটি ও মণ্ডপ কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শুসেন চন্দ্র শীল বলেন, ‘ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হবে। মণ্ডপগুলোতে সিসি ক্যামেরা লাগানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি মন্দির কমিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।’
পুলিশ সুপার জাকির হাসান বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তাসহ যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সার্বক্ষণিক পুলিশের কয়েকটি টহল দলের পাশাপাশি আনসার সদস্যরাও নিয়োজিত থাকবে।’
জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, ‘দুর্গাপূজা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পূজা চলাকালীন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা থাকবে।’