হাসান সিকদার, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৩৮ এএম
আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৩ ১৮:০৩ পিএম
রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আঁকেন চানু মিয়। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
নাম আবু বক্কর সিদ্দিক। চানু পাগলা নামে অধিক পরিচিত। বয়স ৫১ বছর। ভারসাম্যহীন একজন মানুষ। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ভোর হলে চানু মিয়াকে আর পাওয়া যায় না তার বাড়িতে। ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়েন অজানা গন্তব্যে। যেদিকে মন চায়, সেদিকেই ছুটে বেড়ান তিনি। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দেয়ালে আঁকতে থাকেন নানা ধরনের ছবি। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তিনি গড়ে তোলেন অসাধারণ ছবি। তার এসব ছবি দেখে মুগ্ধ সব বয়সি মানুষ। আবার সন্ধ্যা হলে ফেরেন নিজ বাড়িতে। এভাবেই কেটে যায় তার দিন-রাত।
চানু মিয়া পেশায় চিত্রশিল্পী না হলেও যেকোনো পেশাদার চিত্রশিল্পীকে পেছনে ফেলে দেবেন নিঃসন্দেহে। মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময়ের মধ্যে নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তোলেন সব রকমের ছবি। প্রায় ছবিতে দেখা যায়, একজন ছেলে আর একজন মেয়ে। অনেকেই বলেন, ছেলেটি চানু মিয়া, মেয়েটি তার প্রেমিকা। কিন্তু প্রেমিকার নামটি জানা যায়নি। প্রেমিকার ছাড়াও আঁকেন মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ছবি। আবার বিভিন্ন দেয়ালে উপদেশমূলক কথাও লিখে রেখেছেন। কিন্তু চানু মিয়া ভালো করে কথা বলতে পারেন না। আবার যাওবা বলেন, তাও অস্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, সরকারিভাবে সহযোগিতা করলে চানু মিয়া একজন পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারবেন।
জানা যায়, আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে চানু মিয়ার বাড়ি টাঙ্গাইল পৌরশহরের এনায়েতপুর এলাকায়। তিনি ছোটবেলা থেকে একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাচল করতেন। পড়াশোনা করেছেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। ছোটবেলায় পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে মাঠে-ঘাটে কাজ করতেন। আর কাজের ফাঁকে সময় পেলে কচুরিপানা, মাটির টুকরা ও কয়লা দিয়ে আঁকতেন ছবি। সেখান থেকে শুরু তার ছবি আঁকা। তার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তারপর থেকে চানু মিয়া বিভিন্ন চিন্তা করতে করতে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। এরপর ঘুরে ঘুরে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আঁকতে থাকেন। আর এ ছবি আঁকা যেন তার হয়ে গেছে জীবনসঙ্গী।
গত শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চানু মিয়ার সঙ্গে একটি বস্তা। বস্তার ভেতরে কয়লা ও কচুরিপানা আর কিছু কাগজের টুকরো পাশে রেখে পৌরশহরের পার্কবাজারের মোড়ে একটি দেয়ালে চানু মিয়া ছবি আঁকছেন। তার এ ছবি আঁকা দেখতে ভিড় করছে নানা বয়সি মানুষ। তার এ ছবি দেখে সবাই প্রশংসা করছে।
স্থানীয় রবিন সরকার বলেন, আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি চানু মিয়া কচুরিপানা ও কয়লা দিয়ে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আর্ট করে রাখেন। তার ছবি আঁকা খুবই সুন্দর। তার এ ছবি আঁকা দেখে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা উৎসাহী হবে। তাকে সরকারিভাবে সহযোগিতা করলে আরও ভালো ছবি আঁকতে পারবেন।
সোলায়মান হোসেন রাব্বি বলেন, ছোটবেলা থেকে দেখতেছি তিনি বিভিন্ন দেয়ালে গাছের পাতা, কয়লা দিয়ে ছবি আঁকেন। বিভিন্ন দেয়ালে দেখা মেলে একটি ছেলে ও একটি মেয়ের ছবি। সবাই ধারণা করছে মেয়েটি তার প্রেমিকা আর ছেলেটি তিনি। এ ছাড়া তিনি স্বাধীনতার ছবি ও বঙ্গবন্ধুর ছবি আর্ট করেন। তাকে যদি সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হয়, তাহলে আরও ভালো চিত্রশিল্পী হতে পারবেন।
রিকশাচালক ইদ্রিস আলী বলেন, আমি শহরের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে রিকশা চালাই। তখন চানু পাগলাকে বিভিন্ন দেয়ালে ছবি আঁকতে দেখি। যখন যাত্রী না থাকে, তখন রিকশা চালানো বন্ধ করে তার ছবি আঁকা দেখি, অনেক ভালো লাগে। চানু দেয়ালে দেয়ালে ছবি আঁকেন। যে দেয়ালে ছবি আঁকেন, অনেক সময় তাকে বাসার মালিকরা গালিগালাজ করেন। তারপরও চানু মিয়া থেমে জাননি। তার প্রতিভা দেখে সবাই মুগ্ধ। সরকারিভাবে সহযোগিতা করলে তিনি আরও অনেক দূর যেতে পারবেন।
চানু মিয়া ভারসাম্যহীন হওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাংস্কৃতিক কর্মী জসিম উদ্দিন বলেন, চানু মিয়া অনেক সুন্দর ছবি আর্ট করতে পারেন। তিনি একজন ভারসাম্যহীন মানুষ, তারপরও পেশাদার চিত্রশিল্পীর মতো ছবি আর্ট করেন; অনেক প্রশংসনীয়। আমি নিজেও মুগ্ধ তার প্রতিভা দেখে। সরকারিভাবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে আরও ভালো ছবি আর্ট করতে পারবেন। তিনি টাঙ্গাইলের সুনাম অর্জন করতে পারবেন।
টাঙ্গাইল জেলা কালচারাল অফিসার এরশাদ হাসান বলেন, আমি নিজেও দেখেছি চানু মিয়া ভালো ছবি আঁকেন। কেউ যদি চানু মিয়ার দায়িত্ব নিয়ে শিল্পকলা একাডেমি বা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন। আমাদের যতটুকু সুযোগ আছে, অবশ্যই চেষ্টা করব তাকে সহযোগিতা করার।