মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথ
ভোলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৩ ১১:৫৫ এএম
আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৩ ১২:০৫ পিএম
ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার লঞ্চঘাটের একপাশে নোঙর করে রাখা সি-ট্রাক এসটি শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাদ। প্রবা ফটো
নানা অজুহাতে ভোলার তজুমদ্দিন-মনপুরা নৌপথে চলাচলের একমাত্র নৌযান এসটি শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাদ নামের সি-ট্রাকটি বন্ধ রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ পথে চলাচলের সি-ট্রাকই একমাত্র বৈধ নৌযান। ফলে ভোগান্তির শেষ নেই দ্বীপ উপজেলা মনপুরার দেড় লক্ষাধিক বাসিন্দার। উপায় না পেয়ে হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে অবৈধ ট্রলার বা স্পিডবোটে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভোলা নদীবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর এ আট মাস সাগর মোহনার নদীগুলো সাগরের মতো বিপজ্জনক জলসীমানায় পরিণত হয়। এ সময় সি-ট্রাক বা সি-সার্ভে সনদধারী লঞ্চ ছাড়া ৬৫ ফুটের নিচে অন্য নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়কপথে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপ উপজেলা মনপুরার কোনো সংযোগ নেই। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা দ্বীপটির চারপাশেই মেঘনা নদী। নৌপথে মনপুরা থেকে ভোলা সদরের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। বৈধভাবে মনপুরা থেকে মূল ভূখণ্ডে আসার দুটি পথ। একটি হাতিয়া-মনপুরা-ভোলা-ঢাকা, আরেকটি মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথ।
এর মধ্যে ঢাকা-ভোলা-মনপুরা-হাতিয়া নৌপথে চলাচলে অতিরিক্ত সময় লাগে। এই পথে ভোলায় কোনো কাজ নিয়ে গেলে ওই দিন আর ফিরে আসা যায় না, কম করে হলেও দুই দিন সময় লাগে। অন্যদিকে মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথে ঋতুভেদে কিছুদিন চলে লঞ্চ, কিছুদিন চলে সি-ট্রাক।
স্থানীয় ও যাত্রীসাধারণের অভিযোগ, নানা অজুহাতে সি-ট্রাকটি অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখা হয়। কখনও ট্রলার মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে পরিকল্পিতভাবে সি-ট্রাকটি বন্ধ রাখেন ইজারাদার। আবার যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলেও বন্ধ রাখেন। সর্বশেষ শুক্রবার পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বললে সেটা তাদের যাচাই করারও কোনো উপায় নেই। তখন বাধ্য হয়েই তাদের ট্রলার আর স্পিডবোটে যাতায়াত করতে হয়। অথচ এ পথে এই দুটি নৌযানই অবৈধ। চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় উপজেলার জরুরি রোগী ও তাদের স্বজনদের। মনপুরা উপজেলার বাসিন্দা হওয়ায় তাদের অনেকটা বন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মনপুরা থেকে দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার তজুমদ্দিন ঘাটে আসে। যাত্রীসাধারণের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, নারী ও শিশু ছিলেন। যাত্রীসাধারণের পাশাপাশি ট্রলারে গৃহনির্মাণসামগ্রী, মাছের ঝুড়ি, সবজির বস্তাসহ ছাগল ও হাঁস-মুরগি দেখা গেছে।
ট্রলারে আসা সাহাবুদ্দিন আহমেদ নামে একজন যাত্রী বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটিসহ নানা অজুহাতে প্রতি মাসের অর্ধেক সময় সি-ট্রাকটি বন্ধ থাকে। ফলে অফিসের কাজে বাধ্য হয়েই ট্রলারে নদী পারাপার হতে হয়। তখন মনে হয় জীবনটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে পার হচ্ছি। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরুপায় হয়ে ট্রলারে নদী পারাপার হয়।’
জসিম উদ্দিন ও সিরাজ সিকদার নামে দুজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘ট্রলারে মালামাল পরিবহন করা ঝঁকিপূর্ণ। মেঘনার ঢেউয়ের পানি ওঠে প্রায়ই মালামাল ভিজে যায়। এভাবে আমাদের ব্যাপক লোকসান হয়। তাই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এই রুটে যান্ত্রিক ত্রুটিমুক্ত সি-ট্রাক দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি কারণে-অকারণে বন্ধ রাখার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করে দেখার অনুরোধ করছি।’
মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌপথের সি-ট্রাকটি ইজারা নিয়েছে ইয়ানুর এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. নুরুদ্দিন মিয়া বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝে মাঝে বন্ধ থাকলেও নিয়মিত সি-ট্রাকে যাত্রী পারাপার করা হয়। ট্রলার মালিকদের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগসূত্র নেই। বরং ট্রলার চলাচল বন্ধে প্রশাসনকে বহুবার পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত ৫ অক্টোবর থেকে সি-ট্রাকটি আবারও বন্ধ রয়েছে। মেরামত করতে পারলে দুয়েক দিনের মধ্যেই চালু করা হবে।’
নিজেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে মো. হেলাল নামে একজন বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত মাসে ১২-১৩ দিন সি-ট্রাকটি বন্ধ ছিল। এই রুটের জন্য যে সি-ট্রাকটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত পুরোনো। অল্পতেই ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। নতুন একটি সি-ট্রাক দেওয়া হলে এই সমস্যার সমাধান হবে।’
বিআইডব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক (ভোলা নদীবন্দর) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এই নৌপথে নিরাপদে চলাচলে উন্নত সি-ট্রাক দেওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ডেঞ্জার জোনে অবৈধভাবে সি-সার্ভেবিহীন নৌযান চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক আরিফুজ্জামান বলেন, ‘মনপুরা-তজুমদ্দিন নৌরুটে অবিলম্বে সি-ট্রাকটি চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।’ বিষয়টি সমাধানের জন্য বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ও পরিচালককে (অপারেশন) অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।