মো. শামীম মিয়া, নরসিংদী
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৩ ১৭:৩৫ পিএম
নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় হোগলাপাতার একটি কারখানায় দড়ি তৈরি করছেন কর্মীরা। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বেশকিছু গ্রামের বাড়িতে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি হোগলাপাতার হস্তশিল্প কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি জিনিসপত্রের প্রধান উপাদান হোগলাপাতা। এই পাতা দিয়ে তৈরি করা দড়ি কাজে লাগানো হচ্ছে নানাভাবে। উপজেলার বহু মানুষের জীবিকার প্রধান উপায় হয়ে উঠেছে হোগলাপাতার দড়ি। এই হস্তশিল্প বদলে দিয়েছে উপজেলার কর্মহীন নারী-পুরুষের জীবন।
গ্রামীণ জনপদের হতদরিদ্র মানুষগুলোও এখন হোগলাপাতার দড়ি দিয়ে বাহারি জিনিসপত্র তৈরি করে দুবেলা খেয়ে জীবন পার করছেন। নানা কায়দায় দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে পছন্দের কারুপণ্যের রূপ দেওয়া হয়। এসব পণ্য ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের ২৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
উপজেলার প্রত্যন্ত ইউনিয়ন বিন্নাবাইদ। একসময় দারিদ্র্য ছিল এ ইউনিয়নের মানুষের নিত্যসঙ্গী। পুরুষরা সব সময় কাজে ব্যস্ত থাকলেও নারীরা ঘরের কাজ শেষে অবসর সময় কাটাতেন। বর্তমানে ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। গ্রামগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়িতে হোগলাপাতা দিয়ে বিভিন্ন বাহারি পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িত নারী ও পুরুষ। তাদের হাতে তৈরি পণ্য অনেক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কারখানার মালিকরা নারী-পুরুষদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।
এসব হস্তশিল্পে কাঁচা মাল হিসেবে ব্যবহৃত হোগলাপাতার রয়েছে নানা ধরনের নাম। কেউ বলে হোগল, কেউ বলে হোগলাপাতা ও ধারীপাতা। সাধারণত ৫ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার এই হোগলাপাতা রোদে শুকিয়ে বিশেষ কায়দায় এ পাতা পেঁচিয়ে প্রথমে দড়ি বানানো হয়। উদ্যোক্তারা জানান, পণ্যে ব্যবহৃত হোগলাপাতার দড়ি নোয়াখালী ও দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে আনা হয়।
শুধু হোগলাপাতাই নয়- এ এলাকার হস্তশিল্প কারখানাগুলোতে বাঁশ ও পাটের হস্তপণ্যও তৈরি হচ্ছে। হোগলাপাতা, বাঁশ, পাটসহ বিভিন্ন কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হস্তশিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ফুলের টব, কিচেন বাস্কেট, টিস্যু বক্স, শপিং বাস্কেট, ফ্লোর মেটসহ নান্দনিক সব জিনিসপত্র। উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন উৎসবে এসব দেশীয় পণ্য প্রদর্শন সহজলভ্য করা গেলে পণ্যের বিক্রির পাশাপাশি আয় বৃদ্ধি পাবে।
বেসরকারি রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোর মালিকরা বলছেন, সরকারি সহযোগিতা পেলে বিদেশি উৎসবে দেশি পণ্যের অংশগ্রহণ সহজ হবে। অর্ডার বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য রপ্তানি করেও আশানুরূপ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
ইউনিয়নের জুহুরাকান্দা গ্রামের শফিকুল বলেন, ‘আমাদের যতটুকু মূলধন আছে তা দিয়েই আমার বড় ভাই এলাকায় একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অর্ডার পেলেই আমাদের হিমশিম খেতে হয়। অর্ডার অনুযায়ী মাল তৈরির জন্য অতিরিক্ত মালামাল কিনতে গিয়ে কর্মচারীদের মজুরি ঠিক সময়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। সরকার এ শিল্পের দিকে নজর দিয়ে মালিকদের আর্থিকভাবে সহায়তা বা স্বল্প সুদে ঋণ দিত, তাহলে অত্র অঞ্চলে এ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটত।’
সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজের ঘরে বসেই এসব হস্তশিল্পের কাজ করার সুযোগ থাকায় জুহুরিয়া কান্দা গ্রামের অধিকাংশ নারী ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে তারা আজ স্বাবলম্বী। এখানকার অধিকাংশ মহল্লা ও কারখানায় দলবেঁধে চলে কারুপণ্য তৈরির কাজ। কারুপণ্য কারিগররা তাদের শৈল্পিক বিন্যাসের মাধ্যমে পাইকারদের অর্ডার অনুযায়ী তৈরি করছেন মনোমুগ্ধকর হস্তপণ্য।
খালেদা আক্তার নামে এক গৃহবধূ বলেন, তিন সন্তানসহ তাদের পাঁচজনের সংসার। স্বামী কৃষিকাজ করলেও সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। বাধ্য হয়ে গ্রামের অন্য মেয়েদের মতো বিগত চার মাস আগে হোগলাপাতা দিয়ে ঝুড়ি বানানোর কাজ শিখে ওভারটাইমসহ তিনি মাসে ৯ হাজার টাকার পান। এই আয়ে বর্তমানে তার সংসার ভালোই চলছে।
নয়ন নামে শেরপুর জেলার এক বাসিন্দা জানান, তিনি ঢাকার সাভারে কাজ শিখে বছরখানেক ধরে এই কারখানায় কাজ করছেন। সব মিলে মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এখানে তার হাতখরচ বাবদ সামান্য টাকা খরচ হয়। বাকি টাকা তিনি বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
মাপ ও সাইজ ঠিক রাখার জন্য অধিকাংশ কারুপণ্য বানাতে লোহা ও জিআই তারের ডাইস ব্যবহার করা হয়। প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি এসব কারুশিল্প পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বৈদেশিক বাজারে এর চাহিদাও ব্যাপক।
হোগলাপাতা খুব সহজেই পচনশীল হওয়ায় এতে পরিবেশদূষণের কোনো আশঙ্কা নেই। পরিবেশবান্ধব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারিত হওয়ায় হোগলাপণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
বিন্নাবাইদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সুলতানা রাজিয়া স্বপ্না বলেন, এসব হস্তশিল্প কারখানার কারণে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) নরসিংদীর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশীদ বলেন, মূলত নরসিংদীর বেকার ও তরুণদের নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। প্রতিবছর নরসিংদীর সম্ভাবনাময় ১৫০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিসিক থেকে এসব উদ্যোক্তাকে বিনা জামানতে ব্যবসার জন্য ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কিছু শর্ত সাপেক্ষে ৫-১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে।