পাবনা সুগার মিল
পাবনা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৩ ১৪:৫৯ পিএম
তিন বছর ধরে বন্ধ থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে পার্ক করে রাখা গাড়িসহ মিলের মূল্যবান যন্ত্রপাতি। বুধবার পাবনা সুগার মিলে থেকে তোলা। প্রবা ফটো
‘এটা এক প্রকার মৃত। আমাদের মৃত লাশ পাহারা দিতে হচ্ছে। অথচ তিন বছর আগেও এখানে হাজার হাজার মানুষের কোলাহল থাকত। গাড়িভর্তি আখ নিয়ে আসা হতো। আশপাশে অনেক দোকানও ছিল। এখন কিছুই নেই, খালি জঙ্গল আর জঙ্গল। শ্রমিক-কর্মচারীরা পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে বদলি হয়ে গেছেন। আমরা কয়েকজন আছি শুধু এই লাশ পাহারা দিতে। ভাবতেই কেমন যেন লাগে। মিলটি আবার চালুর ব্যবস্থা করুক সরকার।’ কথাগুলো বলছিলেন পাবনা সুগার মিলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নুরুল হোসেন।
তিন বছর আগেও এখানে ছিল ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য আর মানুষের কোলাহল। সেখানে এখন অনেকটাই ভুতুড়ে পরিবেশ। পুরো এলাকা জঙ্গলময়। পার্ক করে রাখা গাড়িতে মরিচা ধরেছে। প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উত্তরের অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান পাবনা সুগার মিলস লি.। নানা জটিলতায় ২০২০ সালে দেশের কয়েকটি সুগার মিলের সঙ্গে পাবনা সুগার মিলের আখ মাড়াই বন্ধ করে দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। এরপর থেকেই মূলত এমন অবস্থা হয়েছে। এতে নষ্ট হচ্ছে শতকোটি টাকার যন্ত্রপাতি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আখচাষিরা। তাদের দাবিÑ পুনরায় মিলটি চালুর করা হোক, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই।
সুগার মিল সূত্রে জানা গেছে, ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অর্থায়নে পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ায় ৬০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় পাবনা সুগার মিলস লি.। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে স্থাপনের কাজ শুরু হয়। পরীক্ষামূলকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু হয় ১৯৯৬-৯৭ সালে মাড়াই মৌসুমে। পরের বছর ১৯৯৭-৯৮ মৌসুম থেকে বাণিজ্যিকভাবে চালু হয় কারখানাটি। তবে উৎপাদন শুরুর পর থেকেই লোকসান গুনতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
মিলটির দৈনিক আখ মাড়াই করার ক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৫০০ টন। আর বার্ষিক উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল ১৫ হাজার টন। আখচাষি, সুগার মিল শ্রমিক-কর্মচারীসহ নানামুখী আন্দোলন আর সংকটে ২০২০ সালের ২ ডিসেম্বর দেশের বেশ কয়েকটি চিনি কলের সঙ্গে পাবনা সুগার মিলেও আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে শিল্প মন্ত্রণালয়।
এদিকে বন্ধের পর থেকেই বিপাকে পড়েছে আখচাষিরা। মিলটিকে ঘিরে পুরো জেলায় সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার একর জমিতে আখচাষ হতো। সেসব জমিতে এখন অন্য ফসলের চাষ করছেন কৃষক। তারা জানান, আখচাষ লাভজনক ছিল। অন্য ফসল চাষাবাদ করে সেভাবে লাভবান হওয়া যাচ্ছে না।
সুগার মিলের আখচাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনসার আলী দিলু বলেন, ‘পুরো জেলায় ৫-৬ হাজার বিঘা জমিতে আখচাষ হতো। সেসব জমিতে এখন অন্য ফসল চাষ হয়। আখ একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং লাভজনক ফসল। মিলটি বন্ধ হওয়ায় জেলার প্রায় তিন হাজার কৃষকের ক্ষতি হয়েছে। আমি নিজেই ২৫-৩০ বিঘা জমিতে আখচাষ করতাম।’
জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘এই মুহূর্তে মিলটি চালুর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপে মিলটি চালু করা যায় কি-না, সে বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা চলছে। এমনটি হলে ভালো হবে। কারণ শুধু চিনি দিয়ে মিলটি চালু রাখা সম্ভব নয়। চিনির কাজ হয় মাত্র কয়েক মাস। বছরের বাকিটা সময় শ্রমিক-কর্মচারীদের তেমন কোনো কাজ থাকে না। এজন্য মিলে লোকসান গুনতে হয়।’
চুয়াডাঙ্গার বৃহত্তম চিনিকল কেরু অ্যান্ড কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এখানেও শুধু চিনি ছাড়া অন্যান্য পণ্য উৎপাদন করতে হবে। যেমন কেরু অ্যান্ড কোং চিনির পাশাপাশি মদ এবং অন্যান্য পণ্য উপজাত হিসেবে উৎপাদন করছে। এতে তারা বছরে শতাধিক কোটি টাকা লাভবান হচ্ছে। আমাদেরও এমন কিছু চিন্তা নিতে হবে। তাহলে মিলটি চালু করা সম্ভব।’