ঐতিহ্য
সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:২৯ পিএম
কিশোরগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে এখন আর দেখা মেলে না ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার। ছবি : সংগৃহীত
ঢোল আর লাঠির তালে তালে নাচানাচি, প্রতিপক্ষের হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা, প্রতিমূহূর্তে টান টান উত্তেজনা- গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার দৃশ্য এটি। কিশোরগঞ্জে একসময় জনপ্রিয় ছিল এই লাঠি খেলা। কিন্তু নতুন কোনো দল না হওয়ায় দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে এই খেলা। একই সঙ্গে হুমকির মুখে এই খেলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন-জীবিকা।
লাঠিখেলা একটি ঐতিহ্যগত মার্শাল আর্ট। খেলার জন্য লাঠিটি প্রায় পাঁচ হাত লম্বা হয়। প্রতিটি লাঠিই থাকে প্রায় তৈলাক্ত। প্রত্যেক খেলোয়াড় তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করেন। চমৎকার এই আয়োজন দেখতে দূরদূরান্ত থেকে হাজির হতো অসংখ্য দর্শক। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বৃদ্ধি ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিবছই আয়োজন করা হতো লাঠিখেলার। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানান বয়সের মানুষ রঙবেরঙের পোশাক পরে মাঠে আসতেন লাঠি খেলতে। প্রখর রোদ আর গরম উপেক্ষা করে দর্শক ভিড় করত খেলা উপভোগ করতে। ঢাকঢোল আর বাঁশির তালে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠত সবাই।
মানুষের এমন উচ্ছ্বাস প্রমাণ করে লাঠিখেলা নিয়ে আগ্রহ ছিল। কিন্তু নতুন দল তৈরি হচ্ছে না। যে কারণে এখন লাঠিখেলার আয়োজন হয় না নিয়মিত।
সদর উপজেলার নধার গ্রামের আমিন আলী লাঠিয়াল বলেন, ‘পূর্বপুরুষরা এ খেলা খেলতেন। সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এ খেলায় নিয়মিত অংশ নিয়েছিলাম। বিভিন্ন জেলায় বায়না করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হতো। কটিয়াদী, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, করিমগঞ্জে লাঠিখেলায় অংশ নিয়েছি। অনেক মেডেল, সিলও (একধরনের কাঠের পদক) জিতেছি। অনেক সময় আমরা আঘাত পেতাম, এতে কোনো দুঃখ ছিল না।’
একই এলাকার শাজাহান উদ্দিন লাঠিয়াল বলেন, ‘যশোদল বাজারের মাঠে বছরে একবার এ খেলার আয়োজন করা হয়। তবে হারানো ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে লাঠিখেলার এমন আয়োজন প্রতিনিয়ত করা উচিত।’
যশোদল বাজারের লাঠিয়াল দুলাল মিয়া জানান, পূর্বপুরুষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় এ লাঠিখেলা খেলেছেন। এখন সেই লাঠিখেলার উৎসব পালন করা হয়ই না বলতে গেলে। তবে এই খেলার সঙ্গে জড়িতরা প্রায় সবাই আর্থিক সংকটে ছিলেন। তারা দুঃখ-দৈন্যে জীবনযাপন করতেন। তাদের জন্য সরকারিভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা নেই। তেমন কোনো ব্যবস্থা হলে নিয়মিত চর্চা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই খেলাকে বড় পরিসরে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারতেন।
ভূবিরচর গ্রামের বাচ্চু হোসেন জানান, এলাকায় লাঠিখেলা বা ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে কয়েকদিন আগে থেকে আত্মীয়স্বজনরা আসত। লাঠিখেলা দেখতে হাজার হাজার দর্শক সমবেত হতো। আনন্দ-উল্লাসে সময় পার হতো। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় কিশোর থেকে প্রবীণ পর্যন্ত কারও তেমন সময় নেই।
নোয়াপাড়া গ্রামের জয় জানান, এ খেলাটি দিন দিন বিলুপ্ত হওয়ার কারণে এর খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না কোনো নতুন দল। আর পুরোনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা অর্থাভাবে প্রসার ঘটাতে পারছেন না এ খেলায়।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী জানান, ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা এখন বলতে গেলে হারিয়েই যাচ্ছে। গ্রামীণ এই ঐতিহ্য রক্ষায় অবশ্যই সবার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।