× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থাভাবে প্রাথমিকেই ঝরে পড়ে আনুকারা

ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:৫৩ এএম

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:৫৮ এএম

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

তানজিনা আক্তারের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল তার তিন মেয়ে আনুকা, নাবিয়া ও পাপিয়া। নাবিয়া পাশেই একটি মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে আর পাপিয়া তৃতীয় শ্রেণিতে। তবে খুব শিগগির তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা ছোট্ট নাবিয়ার। আশপাশের বাস্তবতা তাকে এই আশঙ্কায় ফেলেছে।

বড় বোন আনুকা আক্তারের স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। তবে করোনাকালে প্রাথমিকেই থেমে যায় তার পড়াশোনা। দুই বছর মায়ের সঙ্গে বাসায় সহযোগিতা করে সময় কাটছে তার। আনুকা বলেন, ‘ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হব। আমার পড়া হয় নাই; আমার বোনগুলো যাতে পড়তে পারেÑ এটাই এখন চাওয়া।’

শুধু আনুকাই নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কান্দিপাড়ার তিতাস নদীর কোলঘেঁষা মায়মোলপাড়ার বেশিরভাগ কন্যাশিশুর ভাগ্যে এমনটা জুটেছে। অর্থাভাবে সেখানকার প্রায় সব কন্যাশিশুই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুতে পারছে না। অকালে বাল্যবিয়ে হচ্ছে তাদের। বাকি জীবন রোগ-জরা আর নানা সংকটে কাটছে। 

শুক্রবার (৩০ সেপ্টেম্বর) কান্দিপাড়ার তিতাস নদীর তীরঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গিঞ্জি টিনের ঘরগুলোর সামনে বসে থাকতে দেখা যায় তানজিনা আক্তারকে। তিনি কখনও সেলাই কাজ, কখনও শার্টের বোতাম লাগানো কিংবা পাঞ্জাবিতে সুতার কাজ করে যতটুকু আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালান। তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার তার। ৭ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর একাই সংসারের ঘানি টানছেন। ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় তার। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনিই তৃতীয়। ভাইদের বিভিন্ন জায়গায় কাজে লাগালেও পরিবারের খরচ বাঁচাতে বোনদের বিয়ে দেওয়া হয় খুব অল্প বয়সেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে তিন মেয়ের দায়িত্ব কাঁধে পড়ে তার। বন্ধ হয়ে গেছে মেয়েদের পড়াশোনাও।

তানজিনা বলেন, ‘মেয়েরা যাতে নিজে কইরা খাইতে পারেÑ সেটা চাইছি। আমি বুঝি নাই কম বয়সে বিয়ে করেছি। কিন্তু বড় মেয়েকে ক্লাস ফাইভের পর আর পড়াইতে পারি নাই। এখনই আমার শরীরে নানান সমস্যা। পনেরো বছর বয়সে প্রথম বাচ্চা হয়, পরপর আবার দুইটি। শরীরের এই অবস্থায় যে ভার নিতে হইছে, এখন শরীরে কুলায় না।’

মায়মোলপাড়া নামে পরিচিত এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষের প্রধান পেশা মাছ ধরা। এখানে মূলত মুসলিম জেলেদের বসবাস। তবে ‘মায়মোল’ শব্দটিকে তুচ্ছার্থে গ্রহণ করে তারা। গলিতে ঢুকতেই দেখা যায়, ছোট ছোট মেয়ের কোলে ছোট শিশু। বেশিরভাগেরই পড়া বন্ধ হয়েছে প্রাথমিকেই। 

কিছুটা পথ এগোলে দেখা হয় মিতু বেগমের সঙ্গে, তিনি হাঁড়ি-পাতিল পরিষ্কার করছিলেন। তিন মেয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে কোনোরকম সংসার চলে তার। মিতু বলেন, ‘বড় মেয়ের বয়স ১৭ বছর হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াতে পারলেও তারপর ওর বাবা মারা যান। মেয়ের জন্য ভালো ছেলে পেলেই বিয়ে দিয়ে দেব, এখন আর সংসার টানতে পারছি না। মেজো মেয়েকে অনেক কষ্টে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়েছি আরেকজনের বাসায় রেখে। এখন দুজনকেই বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছি। অন্য জায়গায় দুই বেলা ভালো খেতে তো পারবে।’

লিভার সিরোসিসে মারা যান মিতু বেগমের স্বামী। তখন যা ছিল তা দিয়ে চিকিৎসা করিয়েও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মিতু বেগমের বড় মেয়ে ফারিয়ার বয়স এখন ১৭ বছর। ফারিয়া বলেন, ‘মায়ের সঙ্গে এখানে সেখানে মানুষের বাসায় কাজ করি। পড়ালেখার আশা ছেড়ে দিছি।’

শুধু আনুকা বা ফারিয়া নয়, আর্থিক অনটনে এখানকার বেশিরভাগ কন্যাশিশুই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুতে পারছে না। সরকারি প্রাইমারি স্কুল ও মাদ্রাসা ছাড়া বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ নেই বলে ইচ্ছে থাকলেও পঞ্চম শ্রেণির পর বিনামূল্যে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। যাদের দিন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, শিক্ষার জন্য আলাদা খরচ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে ধারাবাহিকভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিকার হচ্ছে বাল্যবিয়ের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির।

এরই মধ্যে আজ শনিবার ‘বিনিয়োগের অগ্রাধিকার, কন্যাশিশুর অধিকার’ প্রতিপাদ্যে সারা দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রাথমিক পর্যন্ত সরকার বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করলেও মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হয় নিজ খরচে। তবে মাধ্যমিকেও বিনামূল্যে বই ও দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা রেখেছে সরকার। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ না থাকায় অনুন্নত যাতায়াত, আর্থিক সমস্যা, নিরাপত্তাসহ নানা কারণে অনেক নারী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। এইচএসসি কিংবা সমমান পাসের পর সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ে নারী শিক্ষার্থী।

এর কারণ হিসেবে শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও অভিভাবকরা বলছেন, একটা উপজেলায় সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অনেকটিতে স্নাতক (সম্মান) বিভাগ নেই। স্নাতক (সম্মান) বিষয়ে পড়তে হলে যেতে হয় জেলা, বিভাগীয় কিংবা রাজধানীর প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত আবাসিক হল না থাকায় আবাসন সংকট, নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াতে আগ্রহ পান না অভিভাবকরা।

বেসরকারি সংস্থা জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের কন্যাশিশুর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে বাল্যবিয়ের সংখ্যা কমেছে ২৬ শতাংশ। তবুও গত আট মাসে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ২৬০ কন্যাশিশু এবং বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ২১টি বাল্যবিয়ে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ৩৬ কন্যাশিশু। এ ছাড়া নানামুখী চাপে এই সময়ে আত্মহত্যা করে আরও ১৮১ জন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, শিশুদের শিক্ষা বিশেষ করে কন্যাশিশুর শিক্ষা মাধ্যমিকে বিনামূল্যে নিশ্চিত করা দরকার। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি আছে মেয়েদের শিক্ষায় এগিয়ে নেওয়ার জন্য। এখনও সরকারি উপবৃত্তি প্রকল্প আছে, তবে সেটাও সব বিদ্যালয়ে নিশ্চিত করা হচ্ছে না। দেখেও না দেখার ভান করছে বিদ্যালয়গুলো। এসব সুবিধা সম্পর্কেই জানে না বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। সব বিদ্যালয়ে এই সুবিধা যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে না, কোন বিদ্যালয়ে পাওয়া যাবে, কোথায় যাবে, কোনটা অবৈতনিক বিদ্যালয়Ñ সেটা ঠিক করতে হবে। সরকারি পদক্ষেপকে নিশ্চিত করতে হবে। এই কৌশল ও অনুশীলনে ঘাপলা আছে। ঢাকায় বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে বেতন নেওয়া হচ্ছে। এখানে মাধ্যমিক সরকারি বিদ্যালয় ৬০০ বা ৭০০ আছে। মাধ্যমিকে অবৈতনিক সুযোগটা পাচ্ছে কিনা নজরে আনা দরকার। এতে করে প্রান্তিকের মেয়েদের আর্থিক সংকটে বা এই অজুহাতে ঝরে পড়ার সংখ্যাটা কমবে। না হয় বাল্যবিয়ের মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা