রামু ট্র্যাজেডির ১১ বছর
কক্সবাজার অফিস
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০০:৪৭ এএম
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১০:৫৪ এএম
প্রবা ফটো
কক্সবাজারের রামু ও উখিয়ার বৌদ্ধপল্লীতে সাম্প্রদায়িক হামলার ১১ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ভয়াবহ সেই সংঘাত হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এ ঘটনায় দায়ের ১৮ মামলার একটিরও বিচারকাজ শেষ না হওয়ায় হতাশা বিরাজ করছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে। শুক্রবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এসব মামলার দ্রুত বিচারের দাবিতে রামু লালচিং-সাদাচিং-মৈত্রবিহার প্রাঙ্গণে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
ওই দিন উত্তম বড়ুয়া নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডিতে পবিত্র কোরআন অবমাননাকর ছবি পোস্ট করার অভিযোগ তুলে মিছিল নিয়ে রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধপল্লীতে চালানো হয় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট। এতে ১৩টি বৌদ্ধবিহার এবং ৩০টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ৩৭৫ জনের নামে এবং আরও ১৫/১৬ হাজারকে অজ্ঞাত আসামি করে ১৮টি মামলা করে। পরবর্তীতে এসব মামলায় প্রায় ১ হাজারেরও বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। কিন্তু ১১ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত একটি মামলারও বিচারকাজ শেষ হয়নি। এ অবস্থায় বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা।
জেলা দায়রা ও জজ আদালতের পিপি ফরিদুল আলম জানান, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছিল ১৯টি। এর মধ্যে পুলিশ বাদী হয়ে ১৮টি মামলা করে। অন্য মামলাটি করেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি। তিনি পরবর্তীতে বিবাদীদের সঙ্গে আপসনামা দিয়ে মামলাটি খালাস করেছেন। বিচারাধীন ১৮টি মামলায় সাক্ষী না পাওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।
পিপি আরও জানান, কোনোভাবেই সাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে মামলা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকট হচ্ছে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাও সাক্ষ্য দিতে বা হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহী হচ্ছেন না। তবে তিনি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে এসব মামলার বিচারকাজ শেষ করতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। তিনি সাক্ষীদের আদালতে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা কেতন বড়ুয়া জানান, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে রামুতে মিছিল, মিটিং হয়েছে। অনেককেই চেনা গেছে। কিন্তু মামলার পরবর্তী যে প্রক্রিয়া তাতে অনেক চিহ্নিত ব্যক্তি যেমন বাদ পড়েছে, তেমনি নিরপরাধ অনেককেই হয়রানি হতে দেখা গেছে। বৌদ্ধধর্ম শান্তির। এখন সবাই শান্তি চান; যে সম্প্রীতিতে রামুবাসী বসবাস করছে তা যেন রক্ষা হয়। যদি বিচার করতে হয়, তবে চিহ্নিতদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়।
কক্সবাজার জেলা বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি ও রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক ভিক্ষুক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, আলোচিত এ হামলার ঘটনায় এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল তা অনেকটা ঘুচে গেছে। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। বিচারের নামে প্রকৃত অপরাধিদের চিহ্নিত করা জরুরি। এটা করতে গিয়ে নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হোক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সেই উত্তমের খোঁজ জানেন না বাবা-মা
এদিকে এ ঘটনার ১১ বছরে এসেও সেই উত্তম বড়ুয়ার কোনো খোঁজ জানেন না তার বাবা ও মা। এমনকি উত্তমের স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে কোথায় আছেন তারও তথ্য দিতে পারেননি কেউ।
উত্তম বড়ুয়ার বাবা সুদত্ত বড়ুয়া জানান, পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে অর্থকষ্টে চরম দুরবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। ছেলের সঙ্গে কোনোভাবেই এ পর্যন্ত তাদের যোগাযোগ হয়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন সে বেঁচে আছে। কীভাবে বেঁচে থাকার তথ্য জেনেছেন তা বলেননি সুদত্ত। জানান, তার ছেলে দেশে আছে, কি বিদেশ আছে তা জানেন না। প্রধানমন্ত্রী চাইলে ছেলেকে তার কাছে ফিরে আনতে পারেন। মৃত্যুর আগে ছেলেকে দেখতে চান সুদত্ত। মা মাধু বড়ুয়া জানান, ওই ঘটনাটিতে উত্তম কোনোভাবেই জড়িত নয়। তাকে ফিরে আনা হলে সত্য জানা যাবে।
রামুর হাইটুপী পাড়ায় উত্তমের বাবা ও মায়ের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, উত্তমের স্ত্রী রিতা বড়ুয়া ও ১৪ বছরের ছেলে আধিত্র বড়ুয়া সীমা বিহারসংলগ্ন ভাড়া বাসায় থাকে।
দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন
শুক্রবার দুপুরে এসব মামলার দ্রুত বিচারের দাবিতে রামু লালচিং-সাদাচিং-মৈত্রবিহার প্রাঙ্গণে মানববন্ধন কর্মসুচি পালন করে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ। এ সময় বৌদ্ধ নেতা ও ইউপি সদস্য স্বপন বড়ুয়া, রাজেন্দ্র বড়ুয়া, বিপুল বড়ুয়া আব্বু, অর্ক বড়ুয়াসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
মামলার দ্রুত বিচারের দাবিতে মানবন্ধন
বৌদ্ধ যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিপুল বড়ুয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল এই রামু। কিন্তু এক রাতেই পুড়ে গেছে আমাদের হাজার বছরের গর্বের ধন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। আমরা বৌদ্ধ সম্প্রদায় শান্তিকামী জাতি। আমরা শান্তি চাই। ঘটনার পর পর সরকার ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও বসতঘর পুনর্নির্মাণ করে দিয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এবং সরকারের প্রচেষ্টায় হারানো সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বর্তমানে অনেকটা ফিরেছেও। কিন্তু সেই ঘটনার ১৮টি মামলার একটিরও বিচারকাজ শেষ হয়নি। এটাই আমাদের জন্য আশঙ্কার বিষয়। কারণ অপরাধীর শান্তি না হলে ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা থেকেই যায়।’
এর আগে দিনটি উপলক্ষে সংঘদান, অষ্ট পরিষ্কার দান, ধর্মসভায় দেশ ও জাতির মঙ্গল ও সমৃদ্ধি এবং জগতের সব প্রাণীর সুখশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা করা হয়।