হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:৩৫ পিএম
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:৪১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২২ সালের জুনে। এরপর ১৫ মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত চালু হয়নি বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। অপারেটর নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় এখনও ঝুলে আছে টার্মিনাল চালুর প্রস্তাব। সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে ২২ বছরের জন্য অপারেটর নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হলেও এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের।
নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পরও ১৫ মাসে টার্মিনালটি চালু করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। কিন্তু অপারেটর নিয়োগ জটিলতার কারণে এখনও সেটি চালু হয়নি। এর আগে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখেছি। ওই টার্মিনাল রেডি হওয়ার কয়েক বছর পর চালু হয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যদি ঠিক সময়ে সেটি চালু করা না যায়, তাহলে সেটি বন্দরের জন্য যেমন লোকসানের, তেমনি দেশের জন্য ভালো না। পতেঙ্গা টার্মিনাল ঠিক সময়ে চালু করলে সেখানে এত দিনে অনেক জাহাজ ভিড়ত। সেখানে থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হতো। পাশাপাশি বন্দরের সক্ষমতা বাড়ার কারণে বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের সুনাম বাড়ত।’
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল চালুর বিষয়টি তারা অনেক দূর এগিয়েছে। বিদেশি অপারেটর সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী রাফিউল আলম বলেন, ‘রেড সি গেটওয়ের সঙ্গে আমাদের কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে। তাদের কিছু দাবি আছে, সেগুলো নিয়ে কথা হচ্ছে। আমাদেরও কিছু চাহিদা আছে, এগুলো এখনও নিশ্চিত হয়নি। এগুলো নির্ধারিত হওয়ার পর আশা করছি, অক্টোবরের মধ্যে রেড সি গেটওয়ের সঙ্গে চুক্তি করতে পারব। এরপর ডিসেম্বরের মধ্যে আশা করছি টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হবে।’
জেটি-স্বল্পতার কারণে জাহাজ বার্থিংয়ের গতি আনতে বঙ্গোপসাগরের কর্ণফুলী মোহনা থেকে একটু দূরে ড্রাইডক ও চট্টগ্রাম বোট ক্লাবের মাঝামাঝি ৩২ একর জায়গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। ২০১৭ সালের ১৩ জুন প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের পর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ওই সময় কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল বন্দর। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় ফের ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত এক বছর সময় বাড়ানো হয়। এরপর নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলেও অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় এখন পর্যন্ত পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হয়নি। বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত কন্টেইনার টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও সেখানে এখনও শিপ হ্যান্ডলিংয়ের কোনো যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়নি। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে শিগগিরই এটি চালু করা হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, কন্টেইনার টার্মিনালটি চালু করতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় ‘ইক্যুইপ, অপারেট অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স অব পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল’ প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন দেয় সরকার। একই সময়ে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালটিসহ বন্দরের চারটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
পিসিটিতে ‘ইক্যুইপ, অপারেট অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল’ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পিপিপি কর্তৃপক্ষের পরিচালক আলী আজম আল আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল চলতি মাসে (সেপ্টেম্বর) চুক্তিটা শেষ করার। কিন্ত গত ৬ এবং ৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে রেড সি গেটওয়ে থেকে কিছু চাহিদা দেয়। সেগুলো সমঝোতা না হওয়ায় করা যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবগুলো নিয়ে বন্দরের সঙ্গে সমঝোতা হচ্ছে। সমঝোতা হয়ে গেলে খুব বেশি দেরি হবে না। তবে এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, ঠিক কখন চুক্তিটা হচ্ছে।’
রেড সি গেটওয়ে সৌদি আরবের জেদ্দা ইসলামিক পোর্টের বৃহত্তম টার্মিনাল অপারেটর। প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন্দর সম্প্রসারণ ও নির্মাণ করে থাকে।
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপি অথরিটি) জানিয়েছে, ২২ বছরের জন্য পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল। নিজেদের অর্থে যন্ত্রপাতি কিনে ২২ বছরের জন্য এই টার্মিনাল পরিচালনা করবে প্রতিষ্ঠানটি। রেড সি গেটওয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, পিসিটি পরিচালনায় ২৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশি টাকায় ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১১০ টাকা হিসাবে)।
তবে কোন প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনালটি অপারেট করবে সেটি এখনও নির্ধারণ হয়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র জানিয়েছে, রেড সি গেটওয়ে পতেঙ্গা টার্মিনাল অপারেট করলেও বন্দর ট্যারিফ, রিভার চার্জ, নিরাপত্তার বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষই দেখবে। এই হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি অন্য অপারেটরদের মতো জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করবে। এর বিনিময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে লভ্যাংশ শেয়ার করবে।
কোন প্রক্রিয়ায় রেড সি গেটওয়েকে অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘কোন প্রক্রিয়ায় রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল পরিচালনা করবে সেটি এখনও নির্ধারণ হয়নি। তবে আমরা তাদের বলেছি অন্য টার্মিনালগুলোতে যেই ট্যারিফ নির্ধারণ করা আছে। তারাও যাতে একই ট্যারিফ বহাল রাখে। বন্দর ট্যারিফ, রিভার চার্জ, নিরাপত্তার বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকুক সেটি চাই। এসব বিষয় নিয়ে এখন তাদের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের সমঝোতা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঠিক কখন চালু হচ্ছে এটি এখন সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কারণ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করার পর তারা হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি স্থাপন করবে। এই ক্ষেত্রে চুক্তির পর দুই-তিন মাস সময় লেগে যেতে পারে। তবে আমরা চেষ্টা করছি তাদের সঙ্গে দ্রুত চুক্তিটা শেষ করতে।’