ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৯:১৮ এএম
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:১৬ এএম
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে ভাড়াউড়া চা-বাগান। যাওয়ার পথেই চারদিকে সবুজ চা-বাগান, পদ্মের ঝিল, শাপলা ফুল ও সাদা বকের দেখা মিলবে। শহরের কাছাকাছি হওয়ায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা এগিয়ে আছে বলেই ধরা হয় এই চা-বাগানটিকে। তবু স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বাল্যবিবাহের মতো সমস্যাগুলো এখনও এখানে প্রকট। বাগানে পা রাখতেই দেখা যায় হাসপাতালের পাশে একটি ঘরে শিশু, নারী, কিশোরী সবাই দাঁড়িয়ে গল্প করছে। সেখানেই দেখা হয় সুকেশ ব্যাক্তি ও বিনতা হাজরার সঙ্গে।
লোকমুখে শোনা যায়, এই লাইনসহ কয়েক লাইনের মানুষ ভয় পায় সুকেশকে। ভয়ের কারণ জানা গেল সুকেশের কাছ থেকেই। বাগানে বাল্যবিবাহ দেওয়ার জন্য অভিভাবকরা মুখিয়ে থাকেন, সেখানে বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করেন সুকেশ। সাহস নিয়ে প্রতিটি বিয়ে ভেঙে দেন। একটি বিয়ে ভাঙার ঘটনা বলতে গিয়ে সুকেশ বলেন, ‘বিয়ের মণ্ডপে বওয়াইছে আর আমরা গিয়া জামাইরে তুইল্যা বাড়ি পাঠাই দিছি। পরে পঞ্চায়েতে জানাইছি, সিদ্ধান্ত হইছে ছেলেমেয়ের বিয়ের বয়স হইলে একসঙ্গে থাকব, এখন না।’ পেশায় চা-শ্রমিক ২২ বছর বয়সি সুকেশ কাজ শেষ করেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাল্যবিবাহ রোধে পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে কোথাও বাল্যবিবাহের খবর পেলেই ছুটে যান বিয়ে বন্ধ করতে।
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে সুকেশ ব্যাক্তি বেসরকারি সংস্থা ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ সংগঠনের মাধ্যমে নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে পারেন। সুকেশ আসছেন, শোনামাত্রই চা-বাগানের কলোনির লাইনের অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের বাল্যবিবাহ দেওয়ার কথা ভাবতেও ভয় পান। এলাকার যুবকরা নারীদের উত্ত্যক্ত করতে ভয় পায়। কারণ সুকেশ পুলিশ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সহযোগিতায় এ সমস্যাগুলো সমাধানে এগিয়ে এসেছেন।
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়ার চা-বাগানে সুকেশের সঙ্গে বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে কাজ করে যাচ্ছেন বিনতা হাজরা, লিপি হাজরা, হাবিবুল বাশারের মতো কিশোর-কিশোরীরা। গত বছর পাশেই রামপাড়ায় একটি বাল্যবিবাহ বন্ধ হয় কিশোর-কিশোরী ও যুবদলের সদস্যদের সম্মিলিত প্রয়াসে। সময়ের আগে পৌঁছতে না পারায় বিবাহ বন্ধ করতে না পারলেও ১৬ বছরের মেয়েটিকে শ্বশুরবাড়ি যেতে দেওয়া হয়নি। মেয়েটি এখন বাবার বাড়িতেই রয়েছে। উপযুক্ত বয়স হলেই মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে।
বাল্যবিবাহের কারণে একটি মেয়ে বা ছেলে কী কী শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, তারা তা উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে তুলে ধরেন অভিভাবকদের সামনে। শুধু বাল্যবিবাহ রোধ না, অর্থের অভাবে কারও পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, নারীরা যেন স্বাধীনভাবে নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারেন, সেগুলোও দেখছেন তারা।
সুকেশ বলেন, ‘বোনেরা, এলাকার ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে যে রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতাম। তখন এই রাস্তায় কোনো গাড়ি চলাচল করত না। যারা আমাদের সঙ্গে যেত না, স্থানীয় বখাটে ছেলেরা মেয়েদের দেখামাত্র ইভ টিজিং করত। ছোট ভাই হিসেবে তাদের বললাম, যারা তোমাদের রাস্তায় নানাভাবে হয়রানি করে, তাদের আমাকে দেখিয়ে দাও। ওরা আমাকে দেখিয়ে দেওয়ার পর আমি ওদের বাড়িতে যাই। অভিভাবক, বাগান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করি। তাদের বলি, আপনারা ইভ টিজিং বন্ধ ও যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থায় যদি সহযোগিতা করেন তাহলে ভালো হয়। এখন আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে না।’
নিজের বাল্যবিবাহ ভাঙার মাধ্যমে এ সচেতনতামূলক কাজে যুক্ত হন দুর্গামন্দির লাইনের কিশোরী দলের সদস্য বিনতা হাজরা। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই পরিবার থেকে বিয়ে দিতে চায় তাকে। সেই সময়টা নিয়ে বিনতা বলেন, ‘এত সহজ ছিল না বিয়ে ভাঙা। সেই সময় চা-বাগানে বাল্যবিবাহ হতো প্রতি ঘরে ঘরেই। বরং কোনো মেয়েকে বাল্যবিবাহ না দেওয়াটাই ছিল অস্বাভাবিক কিছু।’
এখন বিনতা ২১ বছরে পা দিয়েছেন। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বাবা মারা গেছেন ২০১৯ সালে। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে বিনতা তৃতীয়। মা বিশামতী হাজরা চা-বাগানের শ্রমিক। বাবা মারা যাওয়ার পর মা-ই সংসারের হাল ধরেছেন। এখন টিউশনি করে শুধু নিজের লেখাপড়ার খরচই চালান না, মাকেও আর্থিক সহায়তা করেন।
২০১৪ সালে ১৩ বছর বয়সে ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের জুমেনা নামের এক নারী অধিকারকর্মীর মাধ্যমে নারী-শিশুর অধিকার, নিজের শরীরের সীমানা, যৌন হয়রানি, নারী-শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্পর্কে জানতে পারেন বিনতা হাজরা। তিনি বলেন, ‘বাল্যবিবাহের কারণে একটি মেয়েশিশুর নানা রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাল্যবিবাহ হলে যেকোনো সময় মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হতে পারে। মেয়েটি নিজেই একজন শিশু। সে আরেকটি শিশুকে কীভাবে গর্ভে ধারণ করবে, এর ফলে মা ও শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।’
বিনতা বলেন, এখানে প্রায় ৪০০ কিশোর-কিশোরী রয়েছে। অভিভাবক ও কিশোরীদের পাশে রেখে এ বিষয়গুলো বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। আগের থেকে বাল্যবিবাহ, নারী-শিশু নির্যাতন কমেছে।
ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুবল দাস। কথা শুনে বোঝার উপায় নেই এ বাগানেই বড় হয়েছেন সুবল। খুব সুন্দর বাংলায় বোঝাচ্ছিলেন বাগানগুলোতে বাল্যবিবাহ কেন এত প্রকট। সুবল বলেন, বড়রা একটা কথা বলত, মেয়েকে কোলে বসে দান করলে সুফল আসবে। কোলে মানে বেঁচে থাকতেই বিয়ে দিতে হবে। তার থেকেও বড় বিষয় নিরাপত্তা। এখানে নারী-পুরুষ উভয়ই চা-বাগানে কাজ করে। মেয়েটা বাসায় একা নিরাপদে থাকবে কি না, তা নিয়ে তো ভাবেনই সেই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সংকট আর্থিক। অল্প বয়সেই ছেলেমেয়েরা বাগানে কাজে চলে যায়, পড়াশোনা হয় না। তখন অভিভাবকরা ছেলেটোকে বিয়ে দিয়ে ঘরসংসার দিতে চান।
উদয়ন বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী লিপি হাজরা। চা-বাগান শ্রমিকের মেয়ে হওয়ায় দুই-একজন শিক্ষক ক্লাসে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন। বাগানসংশ্লিষ্ট নয়, এমন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তারা ভালো ব্যবহার করতেন। লিপি বলে, ‘চা-বাগানের কয়েকজন ছাত্রী সোলেমান নামে এক শিক্ষকের কাছে কোচিং করত। একদিন ওই স্যার সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে মন্দ আচরণ করলে মেয়েটি আমাদের সব খুলে বলে। সবাই প্রধান শিক্ষককে ঘটনাটি জানালে তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানান। ওই শিক্ষকের পরে তিন বছরের সাজা হয়।’
চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি নূর মোহাম্মদ বলেন, ভাড়াউড়া চা-বাগানে রেজিস্টার ৪৬৫ পুরুষ ও ৩৪০ জন নারীশ্রমিক কাজ করেন। মাস্টাররোলেও কিশোরী ও নারীশ্রমিকরা কাজ করেন। আগের থেকে এখানে বাল্যবিবাহ অনেক কমেছে, তবে আমরা একটাও বাল্যবিবাহ চাই না। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধেও সচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন জাতির নেতাদের নিয়ে সভা করেছি।
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স শ্রীমঙ্গলের বিটিএস লিডার প্রকল্পের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর পারভেজ কৈরী বলেন, চা-বাগানের নারীশ্রমিক ও তাদের সন্তানরা যৌন হয়রানির শিকার হলেও প্রকাশ না করায় বিচারপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতো। কারণ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ায় তা প্রকাশ হতো না। এ ছাড়া ছোট থেকেই ওরা বিষয়গুলো নিয়ে লুকোচুরি দেখে অভ্যস্ত। এতে অনকে বড় ঘটনাও ওরা মেনে নেয়।