রাউজান (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:০৮ এএম
রাউজানে কলেজছাত্রকে হত্যা মামলার আসামিকে পিটিয়ে মারার ঘটনার পর থেকে স্থানীয় দোকানপাট ও বসতঘরে ঝুলছে তালা। প্রবা ফটো
চট্টগ্রামের রাউজানে কলেজছাত্র সিবলী সাদিককে অপহরণের পর হত্যা এবং সেই ঘটনায় পুলিশের কাছ থেকে আসামিকে ছিনিয়ে পিটিয়ে মারার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় আসামি অজ্ঞাত থাকায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছে অধিকাংশ মানুষ।
স্থানীয় দোকানপাট ও বসতঘরে ঝুলছে তালা। বাজারে কমে গেছে মানুষের আনাগোনা। মসজিদে কমেছে মুসল্লির সংখ্যা। গতকাল রবিবার সরেজমিনে উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের পঞ্চপাড়া গ্রামে এমটাই দেখা গেছে। মূলত গ্রামটি পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
নিহত সিবলী ওই গ্রামের মুহাম্মদ শফির ছেলে। স্থানীয় কদলপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি একটি মুরগির খামারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতেন।
এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও মামলার প্রধান আসামি ছিলেন উমংচিং মারমা। তাকে গ্রেপ্তারের পরে পুলিশের কাছে সিবলীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তাকে নিয়ে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি কাউখালী ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ে সিবলীর লাশ উদ্ধারে যায় পুলিশ। পরে লাশের দেহাবশেষ নিয়ে ফেরার পথে উমংচিং মারমাকে বিক্ষুব্ধ জনতা ছিনিয়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। উমংচিং মারমা রাঙামাটি উপজেলার বেতবুনিয়া ইউনিয়নের রঙ্গিপাড়া গ্রামের উথোয়াইমং মারমার ছেলে।
আসামি ছিনতাই, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও হামলার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের অজ্ঞাতনামা আসামি করে এ ঘটনায় মামলা করে পুলিশ। এরপর থেকেই মূলত গ্রামটিতে গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় কদলপুর শাহী দরবার শরিফের এক খাদেম জানান, মানুষ ভয়ে এলাকায় আসছে না। গত শনিবার সাংবাদিকের মোটরসাইকেল দেখে আতঙ্কে ঘাস কাটা ছেড়ে পালিয়ে যান দুই কৃষক। সালমা ইসলাম তানহা নামের কলেজছাত্রী বলেন, ‘মানুষ এখনও আতঙ্কে রয়েছে। এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।’
আনোয়ারা বেগম নামে এক নারী বলেন, ‘বাড়িতে একা থাকতে হচ্ছে। গরু, হাঁস-মুরগি আছে। সামলাতে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া রাতে নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত থাকি।’ আবদুল লতিফ নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘ওমান থেকে এসেছি এক মাস হলো। ঘটনার সময় ছিলাম না। এমন পরিস্থিতির কারণে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। এলাকায় এখন থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।’
পুলিশ, মামলার এজাহার ও আদালতে দেওয়া দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, গত ২৮ আগস্ট গভীর রাতে সিবলীকে খামার থেকে অপহরণ করা হয়। পরে তাকে রাঙামাটির কাউখালীর গহিন পাহাড়ে আটকে রেখে পরিবারের সদস্যদের কাছে মোবাইলে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। ২৯ আগস্ট সেই পাহাড়ে গলা কেটে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করা হয়। ৩১ আগস্ট আবারও চাওয়া হয় মুক্তিপণ। পরে ২ সেপ্টেম্বর সিবলীর বাবা বান্দরবানে গিয়ে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দেন দুজনের কাছে। কিন্তু ছেলেকে আর ফিরে পাননি তিনি।
জবানবন্দি দেওয়া দুই আসামি হলেনÑ রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের সুইচিংমং মারমা ও কাউখালীর অংথুইমং মারমা। দুই আসামি ১২ সেপ্টেম্বর বিকালে চট্টগ্রামের দুই আদালতে জবানবন্দিতে বলেন, মাসখানেক আগে খামারের কাজ নিয়ে সিবলীর সঙ্গে পাঁচ-ছয়জন শ্রমিকের কথা কাটাকাটি হয়। এর মীমাংসা করে দেন খামারের মালিকেরা। তবে তারা সিবলীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এর জেরে তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।
রাউজান থানার ওসি আবদুল্লাহ আল হারুন বলেন, ‘দুটি মামলার আসামি অজ্ঞাতনামা। ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। কিছু লোককে প্রথম দিন আটক করা হয়েছিল। তারা মূলত ঘটনা দেখতে ভিড় করেছিল। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অপহরণ করে হত্যাসহ সংশ্লিষ্ট সকল ঘটনার তদন্ত চলছে। এলাকার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রয়েছে।’