ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২২ ১৭:৩৩ পিএম
রানীশংকৈল উপজেলার কুলিক নদীর তীরে অবস্থিত ১০৫ বছরের পুরনো মালদুয়ার জমিদার রাজা টঙ্কনাথের রাজবাড়ি
ঠাকুরগাঁও শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে রানীশংকৈল উপজেলা। এ উপজেলার কুলিক নদীর তীরে অবস্থিত ১০৫ বছরের পুরনো মালদুয়ার জমিদার রাজা টঙ্কনাথের রাজবাড়ি।
দীর্ঘদিন যাবত পরিত্যক্ত হয়ে দেয়ালের প্রতিটি অংশ ধ্বংশের পথে। গাছপালায় ছেয়ে গেছে দেয়াল। এর পরেও কমেনি সাধারণ জনগণের কাছে তার কদর। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন ভ্রমণপিপাসুরা এখনো আসছে এটি দেখতে। রাজা টংকনাথের ইতিহাস, রাজবাড়িটির ভবন সংস্কার ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি ভ্রমণপ্রেমিকদের।
জানা যায়, রাজা টঙ্কনাথের পিতা বুদ্ধিনাথ ছিলেন মৈথিলি ব্রাহ্মণ। রাণীশংকৈল থেকে ৭ কিলোমিটার পূর্বে কাতিহার শ্যামরাই মন্দিরের সেবাইত ছিলেন বুদ্ধিনাথ। উক্ত মন্দিরটির মালিক ছিলেন ঘোষ বা গোয়ালা বংশীয় নিঃসন্তান এক জমিদার। বৃদ্ধ গোয়ালা জমিদার কাশিবাসে যাওয়ার সময় সমস্ত জমিদারি সেবায়েতের তত্ত্বধানে রেখে যান এবং দলিল করে যান যে, তিনি কাশি থেকে ফিরে না এলে সেবাইত বুদ্ধিনাথ জমিদারির মালিক হবেন।
পরে জমিদার ফিরে না আসলে বুদ্ধিনাথ জমিদারির মালিক হয়ে যান। তবে অনেকে মনে করেন এ ঘটনাটি বুদ্ধি নাথের দু-এক পুরুষ পূর্বেরও হতে পারে। মতান্তরে আঠার শত খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে মালদুয়ারের নাম ছিল রামগঞ্জ। সে সময় এলাকার জমিদারি ছিল দুই সহদরের হাতে। নাথপন্থী এই সহদরা যুগল ছিলেন চিরকুমারী। তারা পরিচিত ছিলেন বড় রাণী ও ছোট রাণী হিসেবে। উভয় রাণী কাশীধামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে জমিদারি বুদ্ধিনাথের নামে লিখে দেন। কথা ছিল তারা ফিরে না আসলে জমিদারি সেবায়েতের হয়ে যাবে। রাণীরা আর ফিরে আসলেন না। রাজবাড়ী নির্মাণের কাজ বুদ্ধিনাথ শুরু করলেও সমাপ্ত করেন রাজা টংকনাথ রায়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে রাজবাড়ীটি নির্মিত হয়। বুদ্ধিনাথের তিন ছেলে রাম নাথ, টঙ্কনাথ ও গৌরাঙ্গ নাথ। রাম নাথের অকাল মৃত্যু হয় গৌরাঙ্গ ছিল হাবা গোবা। টঙ্কনাথ ছিল চতুর। বুদ্ধিনাথের মৃত্যু হলে টঙ্কনাথ সমস্ত জমিদারি হাতিয়ে নেন।
ঊনবিংশ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে এই জনপদটি ছিল মালদুয়ার পরগনার অন্তর্গত। পরে টঙ্কনাথ ব্রিটিশ সরকারের আস্থা লাভ করে মালদুয়ার স্টেট গঠন করেন। কথিত আছে, টাকার নোট পুরিয়ে জনৈক ব্রিটিশ রাজ কর্মচারীকে চা বানিয়ে খাইয়ে টঙ্কনাথ চৌধুরী উপাধি লাভ করেন। এর পর দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজা নাথ রায়ের বশ্যতা স্বীকার করে রাজা উপাধি পান।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের শাসন থেকে মুক্ত হলে রাজা টঙ্কনাথ চৌধুরী ১৭ আগস্ট স্বপরিবারে ভারতে চলে যান। বিশাল রাজবাড়ী জীর্ণশীর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমান রাজবাড়ীটির অনেক অংশই নষ্ট ও ধ্বংস হয়ে গেছে। চারপাশে ছিন্নমূল মানুষের বসবাস। যে কোন মুহূর্তে রাজবাড়ীটি ভেঙে পড়তে পারে। চুরি হয়ে যাচ্ছে ইটসহ দামী সৌখিন দরজা, জানালা ও লোহার বিভিন্ন জিনিসপত্র।
রাজা টংকনাথের স্মৃতি বিজড়িত কীর্তিকে অমর করে রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করে ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ধরে রাখার প্রবল প্রত্যাশা ব্যাক্ত করেন রাণীশংকৈলবাসী।
রাজবাড়িটি দেখতে আসা হুমায়ুন কবির বলেন, অনেক দিন যাবত শুনে আসছি ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলায় রাজা টঙ্কনাথ নামে একটা রাজ বাড়ি আছে তাই আমিসহ আমার কয়েকজন বন্ধুমিলে চলে আসছি দেখতে। বাড়িটা দেখতে বেশ। তবে শেওলা দিয়ে ভরে গেছে। দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। আমরা চাই সরকার এটার মেরামত করে পর্যটন স্পট হিসাবে গড়ে তুলুক। তাহলে আমাদের মত অনেকে এসে এই বাড়িটার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। এটাকে মেরামত করা হয়, তাহলে আবারো ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িটি সকলের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
রাজবাড়ি দেখতে আসা আবু বক্কর বলেন, আমার বউয়ের অনেক বায়না ছিল এই রাজবাড়িটি দেখতে। অনেকের মুখেই শুনেছিলাম এটার কথা। বাড়িটি অনেক সুন্দর কিন্তু দেখতে ভয় লাগছে। কারণ এটা পুরোটাই একটা জঙ্গলের মতো হয়ে গেছে। দেওয়ালে ফাঁটল যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে।
বাড়িরটি দেখতে আসা মনিরা আক্তারর বলেন, আমি বাড়িটি দেখতে আসছি আমার ভাল সাথে। বাড়িটা সব পাশে ঝোপঝাড়। ময়লা স্তুপে পরিণত হয়েছে। রাজার বাড়ির এই অবস্থা কেন। আমি এটা পর্যটন শিল্প হিসাবে গড়ে তোলার দাবি জানাই সরকারের কাছে।
রাণীশংকৈল ডিগ্রী কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম বলেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য একটি জাতি বা এলাকার একটি বড় সম্পর্দ। এই ইতিহাস গুলোকে সংরক্ষণ করা সরকার দায়িত্ব। আমাদের ঠাকুরগাঁও জেলায় তেমন কোথাও রাজবাড়ি নেই। এই রাজবাড়িটা যদি সংস্করণ করা যেত পর্যটকদের জন্য যেমন আকর্ষণ, আমার ইতিহাসকেও একই ভাবে রক্ষা হতো। আমি চাই এইটি সংস্কার করা হোক।
এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক মাহাবুবুর রহমান বলেন, এই সরকার যে সকল স্থান পর্যটন আকর্ষণ করতে পারে সেসকল স্থানকে সংস্কার করে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে রুপান্তির করছে। আমরা রাজা টঙ্কনাথের রাজবাড়িটি সংস্কার করে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে রুপান্তির করা জন্য পর্যটন মন্ত্রালয়ে প্রেরণ করেছি। ইতোমধ্যে এটি পরিদর্শন করেছি। চেষ্টা করবো এটি সংস্কার করে ঐতিহ্যকে ফিরেয়ে আনার।