কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১০:৫৯ এএম
আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:০১ এএম
খাল পারাপারে ভরসা একটিমাত্র দাঁড়টানা নৌকা। প্রবা ফটো
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পাশাপাশি দুটি গ্রাম পাঁচজুনিয়া ও ছৈলাবুনিয়া। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে পাঁচজুনিয়া খাল। পূর্ব পাড়ে পাঁচজুনিয়া গ্রামে দক্ষিণ চালতাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পশ্চিম পাড়ের ছৈলাবুনিয়া গ্রামের শিশুশিক্ষার্থীসহ সবাইকে খাল পার হয়ে এপারে আসতে হয়। আর খাল পারাপারে ভরসা একটিমাত্র দাঁড়টানা নৌকা।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও দাঁড়টানা নৌকায় পার হয়ে পাঁচজুনিয়া গ্রামে যেতে হয়। প্রতিদিন অন্তত ২০ জন শিশু দাঁড়টানা নৌকায় পারাপার হয়ে বিদ্যালয়ে যায়। নৌকায় বড় কোনো যাত্রী না থাকলে ছোট ছেলেমেয়েদেরই নৌকা চালাতে হয়। ফলে প্রায় সময়ই তাদের একটা আতঙ্ক নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়। রোগীদের চিকিৎসায় হাসপাতালে নিতেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পাঁচজুনিয়া খালের পূর্ব পারে পাঁচজুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বৃহস্পতিবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে গিয়ে দেখা যায়, তখনও বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু হয়নি। পাঁচজুনিয়া খালের পাড়ের দিকে তাকিয়ে শিক্ষকরা অপেক্ষা করছেন। ওই গ্রামের শিশুরা খাল পার হয়ে বিদ্যালয়ে আসে। খালের পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি নৌকা বাঁধা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ধানখালী ইউনিয়নের পাঁচজুনিয়া ও ছৈলাবুনিয়া গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া পাঁচজুনিয়া খালটির দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার ও প্রস্থ ২০০ মিটার। যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এই খাল পার হয়ে যেতে হয় উপজেলা সদর, ইউনিয়ন পরিষদ এবং কালু মিয়ার বাজার, তহশিল অফিস, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে। তাই বহু বছর আগে পারাপারে জন্য এ খালে একটি দাঁড়টানা নৌকার ব্যবস্থা করেন স্থানীয় লোকজন। বর্তমানে এ নৌকায় খাল পারাপার হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, একটি কলেজের শিক্ষার্থীসহ ২০ গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ।
অনেক সময় শিশুরা নিজেরাই দাঁড়টানা নৌকা পাঁচজুনিয়া গ্রামের দিকে নিয়ে যায়। খালপাড়ে শিশুরা অপেক্ষা করতে থাকে, কখন নৌকাটি আসবে। পরে তারাও এভাবে খাল পার হয়। বিদ্যালয় ছুটি শেষে একইভাবে তারা বাড়িতে ফিরে যায়। আর এ খাল পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কৃষকরাও। অন্তঃসত্ত্বা নারী কিংবা অসুস্থ রোগীদের নিয়ে খাল পারাপারে পোহাতে হয় ভোগান্তি। তাই এই খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চালতাবুনিয়া ৭২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া বলছে, ‘আমরা অনেকেই নৌকা চালাতে পারি না। স্কুলে আসার জন্য আমাদের দাঁড়টানা নৌকা চালাতে হয়।’ দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আসমা বলেছে, ‘আমরা নৌকা চালাইয়া স্কুলে আই-যাই। দাঁড় টাইন্না নৌকা চালাইতে হয়।’
চালতাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ বলেন, ১১৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০ জনের মতো রয়েছে ছৈলাবুনিয়া গ্রামের। শিশুরা ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে এ খালে একটি সেতু নির্মাণ করা দরকার।
উত্তর ছৈলাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফরিদ হোসেন জানান, সেতু না থাকায় কৃষকরা কৃষিপণ্য ঠিক সময়ে বাজারে নিতে পারেন না। এতে তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণ হলে বদলে যেত গ্রামের চিত্র। তারা বারবার মেম্বার ও চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছেন। সবাই বলেছে সেতু নির্মাণ করে দেবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা অবহেলিতই রয়ে গেছেন। এলাকার মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে তারা বড় ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। এ ছাড়া অসুস্থ রোগীদের নৌকায় করে হাসপাতালে নেওয়া অনেক কষ্টকর।
ধানখালী এএসএইচ আশরাফ একাডেমির ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমনের দাবি, ‘আমরা এই খাল পার হয়ে স্কুলে যাই। অনেক সময় ভয় করে। কয়েকদিন আগেও খালে এক শিক্ষার্থী পড়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির সময় খালে স্রোত থাকে, তখন আরও বেশি ভয় লাগে। ব্রিজ হলে আমাদের অনেক উপকার হবে।’
এএসএইচ আশরাফ একাডেমির শিক্ষক মো. রিপন বলেন, খালটি অনেক গভীর ও বড়। তাই ছোট ছাত্রছাত্রীরা নৌকার দাঁড় টানতে গিয়ে খালে পড়ে যায়। তাদের কথা চিন্তা করে এ খালে একটি সেতু নির্মাণ করা দরকার।
ধানখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাদা পারভেজ টিনু মৃধা জানান, পাঁচজুনিয়া খালের ওপর জরুরি ভিত্তিতে একটি গার্ডার সেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এ ব্যাপারে এলজিইডির কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল বারী বলেন, ‘পাঁচজুনিয়া খালের ওপর ৯০ মিটারের একটি ব্রিজ নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। প্রস্তাবটি পাস হলে ব্রিজ নির্মাণকাজ শুরু হবে।’