ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৯:১১ এএম
আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১০:৪৬ এএম
পাওলুস নানুয়ার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এখন চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত।
বাবা জেবিয়ার নানুয়ার পেশায় ছিলেন চা-বাগানের বাঘাল (শ্রমিক)। মা মার্তা এন্দোয়ারও চা-বাগানে টুকটাক কাজ করতেন। দুজনের হাজিরায় কোনো রকমে খেয়ে-না খেয়ে চলত অভাবের সংসার। এমন একটি পরিবারের সন্তান পাওলুস নানুয়ার; যিনি শত বাধা ডিঙিয়ে অর্জন করেছেন উচ্চশিক্ষা। তা-ও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
জেবিয়ার নানুয়ার-মার্তা এন্দোয়ার পরিবারের বসবাস চায়ের রাজধানীখ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফিনলে টি কোম্পানির বর্মাছড়া চা-বাগানে। নিভৃত পাহাড়ি জনপদের ১৮ পরিবারের একটি হলো এই পরিবার।
এ পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দাদের যেখানে অন্ন-বস্ত্র-চিকিৎসার অর্থ জোগানো কঠিন, সেখানে বাড়ি থেকে প্রায় ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ ছিল স্বপ্নের মতো। তবে খ্রিস্টান মিশনের সহযোগিতা আর অদম্য ইচ্ছায় পরিবারটির তিন সন্তান লাভ করতে পেরেছেন উচ্চশিক্ষা।
মেজো সন্তান পাওলুস নানুয়ার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে বর্মাছড়া চা-বাগানের পাশের বিদ্যাবিল চা-বাগানে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে দৈনিক ১৭০ টাকা হাজিরায় কর্মরত রয়েছেন। শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও পাওলুস নানুয়ার চা-বাগানে বাবার বদলি শ্রমিক হিসেবে কাজে নিয়োজিত থেকে সংসারের দারিদ্র্য হ্রাসে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ওই নিভৃত পল্লীর ১৮ খ্রিস্টান পরিবারের মধ্যে কার্লুস কেরকাটার ছেলে শিমন কেরকাটা ২০২১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বেকার জীবনযাপন করছেন। এ ছাড়া রবি কেরকাটার ছেলে বিনসেন্ট কেরকাটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যায়নরত।
গত ২৭ আগস্ট বিকালে পাওলুস নানুয়ারের সঙ্গে কথা হয় বর্মাছড়া খ্রিস্টানপল্লীতে। তিনি জানান, ১৯৮৯ সালের ৯ মার্চ পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার পরিবারে আর্থিক অবস্থা চরম খারাপ ছিল। ছয় বছর বয়সে পরিবার তাকে স্থানীয় বর্মাছড়া শিশু নিকেতন স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করে। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভর্তি হন শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সপ্তম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পর খ্রিস্টান মিশনের সহযোগিতায় তিনি অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন নবাবগঞ্জ জেলার ভান্ডুরা হলিক্রস স্কুলে। থাকতেন মিশনের হোস্টেলে। সেখান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন ঢাকার নটর ডেম স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এসএসসি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত মিশনের সহযোগিতা ও বৃত্তির টাকায় পড়ালেখা চলমান ছিল। এইচএসসি পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।
২০১৫ সালে তিনি সেখান থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরই মাঝে ২০১৪ সালে বিসিএস ও বেশ কয়েকটি চাকরির পরীক্ষার হলে বসলেও চাকরি মেলেনি। তবে কিছুদিন টেক্সটাইলে চাকরি করেন। পরে বাবার বাগানের শ্রমিকের চাকরির মেয়াদ শেষ হলে ও মায়ের অসুস্থতার কারণে পাওলুস ফিরে আসেন চা-বাগানের গণ্ডিতে। সেখানে বাবার শ্রমিকের চাকরিতে যোগ দিয়ে পরিবারের হাল ধরেন তিনি। বর্তমানে ১৭০ টাকা দৈনিক মজুরিতে চা-বাগানের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে পাওলুস নানুয়ার বলেন, ‘পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল না হলেও ছোটবেলা থেকেই আমার ও আমার ভাই-বোনদের পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। ভবিষ্যতে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করে সংসারের চাকা সচল রাখার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করে ফিরে এসেছি আমার ঠিকানা চা-বাগানে। সেখানে বাবার শ্রমিকের কাজ করে যা আয় করি, তা দিয়েই আমি সন্তুষ্ট। এটিই আমার স্বপ্নের ঠিকানা।’
তিনি বলেন, ‘আমার বড় ভাই একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি করেন ও বিবাহিত ছোট বোন বর্মাছড়া শিশু নিকেতন স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করি, তখন একটি জাতীয় দৈনিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ভালো ফুটবল খেলতাম। লেখাপড়াকালীন রাজশাহী বিভাগসহ দেশের নানা প্রান্তে ক্ষ্যাপ (ভাড়াটিয়া খেলোয়াড়) খেলে যে টাকা উপার্জন করতাম, তা দিয়ে নিজের খরচ মিটিয়ে পরিবারকেও সহযোগিতা করতাম। একসময় খেলা ছেড়ে দিয়ে চাকরির পেছনে ছুটতে থাকি। তবে চাকরি করা আর হয়নি। অবশেষ মায়ের অসুস্থতা, বাবার চাকরির মেয়াদ শেষ হলে পরিবারের দারিদ্র্য কমাতে চলে আসি শ্রীমঙ্গলে। সেখানে চা-বাগানে শ্রমিকের কাজ শুরু করি। এখনও এই কাজই করছি। শ্রমিক হিসেবে কাজ করে কোনো দুঃখ নেই, অনুতাপ নেই। বাপ-দাদারা যুগ যুগ ধরে চা-বাগানের শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তাদের উত্তরসূরি হয়ে আমিও শ্রমিকের কাজ করছি, এতে বরং গর্ব হচ্ছে।