শ্রীমঙ্গলে রিসোর্টে খুন
মৌলভীবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৩ ২১:৪০ পিএম
আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৩ ১১:২৮ এএম
হত্যার শিকার হওয়া শফিকুল ইসলাম ( টুপি পড়া)। ছবির বাকি দুজন তার বন্ধু ও হত্যায় অভিযুক্ত আসামি। প্রবা ফটো
‘আমার সাড়ে তিন বছরের মেয়ের জন্মের পর এক রাতের জন্যও কোথাও যায়নি ওর বাবা। ঘুমিয়ে যেত বাবার বুকেই। ওর বাবা খাইয়ে না দিলে কিছুই খেতে চাইত না। এত দিন পর হঠাৎ ভ্রমণে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরতে হলো লোকটাকে। মেয়েটা শুধু বাবা-বাবা করছে। কী জবাব দেব ওকে।’
তিন বন্ধুর সঙ্গে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে নিহত শফিকুল ইসলামের স্ত্রী মুন্নী বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে কাঁদতে কাঁদতে এসব কথা বলেন।
মুন্নী বেগম বলেন, তারা ২৪ আগস্ট রাতে রওনা হন। পরের দিন শুক্রবার শ্রীমঙ্গলে পৌঁছেই শফিকুল মোবাইল ফোনে কথা বলেছিলেন মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটি তার বাবাকে বলেছিল, তুমি কোথায়, বাসায় আসো। তার বাবা ঠিকই বাসায় আসল, তবে লাশ হয়ে। তাকে ছাড়া এখন আমরা কীভাবে বাঁচব?
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ডলুছড়া (ডলুবাড়ি) গ্রামে অবস্থিত লেমন গার্ডেন রিসোর্টে খুন হন শফিকুল। পুলিশ ধারণা করছে, ব্যবসায়িক লেনদেন বা ভ্রমণে আসার পর নিজেদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্বের কারণে এই খুনের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
এই খুনের ঘটনায় মুন্নী বেগম বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে গতকাল সোমবার সকালে শ্রীমঙ্গল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ এরই মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ওসি জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার। তিনি বলেন, তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারলে ঘটনার রহস্য উদঘাটন হবে।
বাদী মুন্নী বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তার স্বামী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ঢাকার ভাটারা এলাকায় কাগজের কার্টন কেনাবেচার ব্যবসা ছিল। তাদের মূল বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুর উপজেলার হাঁটুভাঙ্গা গ্রামে। বর্তমানে তারা ভাটারা এলাকার ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের ফাঁসেরটেক নামক স্থানে সপরিবারে বসবাস করছেন। তাদের আরেকটি ছেলে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, রবিবার শ্রীমঙ্গল থানা থেকে একজন কর্মকর্তা ফোনে তার স্বামীর নিহতের কথা জানান। রাতেই তিনি তার ছোট ভাই, দেবর, দেবরের শ্যালকসহ ছুটে আসেন শ্রীমঙ্গলে। সোমবার সকালে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন: শ্রীমঙ্গলে রিসোর্টে রহস্যঘেরা ‘খুন’, ৩ জনের নামে মামলা
লেমন গার্ডেন রিসোর্টের স্টাফ সহিদুল ইসলাম জানান, শুক্রবার সকাল পৌনে ৮ টার দিকে চাঁদপুর জেলার শাহারাস্তি উপজেলার খাসেরবাড়ি গ্রামের আবুল খায়েরের ছেলে মো. নুরুল আমিন রাব্বি, নিহত শফিকুল ও তাদের আরও দুই বন্ধু লেমন গার্ডেন রিসোর্টের বৃষ্টিবিলাশের ৫ নম্বর কক্ষে ওঠেন। পরদিন শনিবার রাত ১১টার দিকে তিনজন রিসোর্ট ম্যানেজারকে কক্ষের ভাড়া পরিশোধ করে জানান, তাদের অপর দুই বন্ধু (আসলে একজন) কক্ষে অবস্থান করছেন এবং রবিবার দুপুর ১২টার দিকে তারা চেক আউট করবেন। শনিবার রাতেই তিন বন্ধু চলে যাওয়ার পর রবিবার দুপুরে রিসোর্টের স্টাফ সহিদুল ইসলাম ও রুহান আহমেদ কক্ষটির সামনে গিয়ে তালাবদ্ধ দেখতে পান। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় তারা জানালা দিয়ে দেখতে পান একজন রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানার ওপর পড়ে আছেন। রিসোর্টের দেয়ালে ও বিছানায় রক্তের দাগ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তারা বিষয়টি রিসোর্টের ম্যানেজারকে জানালে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশকে জানায়। পরে ওসি জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিকল্প চাবি দিয়ে কক্ষের তালা খুলে শফিকুলের মরদেহ উদ্ধার করেন। সন্ধ্যার দিকে মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মনজুর রহমানসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ওসি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ময়নাতদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে শ্রীমঙ্গল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করছেন না।