কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৩ ০৯:১২ এএম
কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার-সংলগ্ন বেড়িবাঁধ রক্ষিত ২০০ বছরের পুরোনো নৌকা। প্রবা ফটো
কুয়াকাটা সৈকতের বুক চিরে জেগে ওঠা অন্তত ২০০ বছরের পুরোনো পালতোলা নৌকাটি ১০ বছরেও স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। সৈকতের ঝাউবাগান-সংলগ্ন বালুর নিচ থেকে ২০১৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সেনাবাহিনীর সহায়তায় নৌকাটি কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহার-সংলগ্ন বেড়িবাঁধের পাশে স্থাপন করে। সেই থেকে আজও অরক্ষিত রয়ে গেছে নৌকাটি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নৌকা সংরক্ষণের জন্য যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা, তার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় সংরক্ষণকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। শিগগির এ সমস্যার সমাধান হবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের পাশে পাউবোর যে জমির ওপর বর্তমানে নৌকাটি রয়েছে, সেখানেই একটি অবকাঠামো তৈরি করে এ অমূল্য নিদর্শনটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হবে; যা রূপান্তরিত হবে ‘নৌকার জাদুঘর’ হিসেবে। এজন্য ২৩ শতাংশ জমি বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাউবো থেকে মৌখিকভাবে জমিটি ব্যবহারের জন্য বলা হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়নি। ২০১২ সালের জুলাইয়ে কুয়াকাটা সৈকতের পূর্বদিকে ঝাউবাগান-সংলগ্ন সাগরপাড়ে বালুর মধ্যে কাঠের এই নৌকাটি পাওয়া যায়। প্রথমদিকে নৌকার পুরো কাঠামোর মাত্র দুই ফুট বালুর ওপরে জেগে থাকা অবস্থায় স্থানীয় লোকজন দেখতে পায়।
স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের পূর্বপুরুষরা এই নৌকাযোগে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে আসার দাবি করলেও নৌকাটি তাদের জমিতে স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছে। নিজেদের জমি দাবি করে প্রাচীন এই নৌকাটি সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে বিভিন্ন সময় উদ্যোগও নেয় রাখাইনরা।
পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নৌকাটি ২০১২ সালে জেলেদের মাধ্যমে সবার নজরে আসে। সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরত্বে পূর্বদিকে বালুর বুক চিরে নৌকাটি তখন সামান্য বেরিয়ে আসে। এরপর গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরে আসে। তাদের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় পরিদর্শন শেষে নৌকাটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ফরাসি নৌকা বিশেষজ্ঞ ইভাস মারের নেতৃত্বে একটি টিম নৌকাটি উত্তোলনে কাজ শুরু করেও ব্যর্থ হয়। ২০১৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর টেকনিক্যাল সহায়তায় বাংলাদেশ রেলওয়েকে সম্পৃক্ত করে নৌকাটি তুলে বৌদ্ধবিহারের পাশে প্রতিস্থাপন করা হয়।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮০-৯০ সাল পর্যন্ত নৌকাটি কুয়াকাটা সৈকতের একই স্থানে বালুর ওপর কিছু অংশ জেগে থাকতে দেখা যায়। পিতলের পাতে মোড়ানো নৌকার বিভিন্ন অংশ স্বর্ণের পাত ভেবে তখন দর্শনার্থীরা খুলে নিয়ে যায়। মানুষের মুখে মুখে ‘সোনার নৌকা জেগে ওঠার’ গুজব ছড়িয়ে পড়ায় তখনও নৌকাটি দর্শনে অসংখ্য মানুষ ভিড় করত। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের জলোচ্ছ্বাসে এটি বালুর নিচে চাপা পড়ে। একইভাবে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বালু সরে গিয়ে পুনরায় দৃশ্যমান হয় নৌকাটি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নৌকাটির দৈর্ঘ্য ৭২ ফুট, প্রস্থ সাড়ে ২৪ ফুট এবং উচ্চতা সাড়ে ১০ ফুট। এর ওজন আনুমানিক ৯০ টন। নৌকাটি তৈরি করা হয় অন্তত ২০০ বছর আগে। স-মিল বা আধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় তখনকার সময় ছেনি বা কুঠার দিয়ে তেমন কোনো ফিনিশিং ছাড়াই তৈরি করা হয় এটি। ব্যবহার করা হয়েছে গর্জন অথবা শালকাঠ। পুরো একটি গাছ দিয়েই তৈরি করা হয় নৌকার বাহা, গছা ও গুড়ার কাজ। নৌকা থেকে উদ্ধার করা হয় তামার তৈরি পেরেক, নারিকেলের মালা, নারিকেলের ছোবলা দিয়ে বানানো রশি, ভাঙা মৃৎপাত্রের টুকরো, প্রচুর ধানের বহিরাবরণ/চিটা, পাটকাঠি, মাদুরের অবশেষ, পাটের তৈরি ছালার নিদর্শন, লোহার ভারী ও বিশালাকৃতির শিকল। যার মধ্যে বেশকিছু নিদর্শন বর্তমানে বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরে প্রদর্শিত রয়েছে। তবে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের রসায়নাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে নৌকাটি জাম্বুল কাঠের তৈরি বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিশেষজ্ঞ দলের ধারণা, ৯০ টন ওজনের এই নৌকাটি ২০০ বছর বা তারও অধিক পুরোনো, এটি রাখাইনদের তৈরি নৌকা হতে পারে। পর্তুগিজ জলদস্যুদের ব্যবহৃত নৌকা হতে পারে বলেও কেউ কেউ ধারণা করছেন। কুয়াকাটার কেরানীপাড়া রাখাইন নেতা উচাচিং মাতুব্বরের ভাষ্যমতে, এই নৌকা তাদের পূর্বপুরুষরাই আরাকানে বসে তৈরি করেছেন। এরপর এমন অন্তত ৫০টি নৌকাযোগে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে এসে ১৭৮৪ সালে বাংলাদেশের কুয়াকাটাসহ বেশ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
সত্তরোর্ধ্ব শিরো ভূঁইয়া বলেন, ‘১৯৮০ সালের পর কুয়াকাটা সাগরপাড়ের পূর্বদিকে তিন কিলোমিটার দূরে একটা সোনার নৌকা ওডার (ওঠার) খবর হুইন্যা আমরা দেখতে যাই। তহন পুরাপুরি নৌকাডা বালির ওপরে ভাসে নাই। এর কয়েক বচ্ছর পর আবার বালির নিচে তলাইয়া যায়। পরে আবার যহন পাওয়া যায় তহন বুজ্জি এই নৌকাই হেই নৌকা।’
কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা কয়েকজন পর্যটক বলেন, নৌকাটি উদ্ধার করা হয়েছে গত ১০ বছর আগে। অথচ এখনও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা অফিসের সহকারী গবেষক গোলাম ফেরদৌস আলম জানান, রাখাইনদের সঙ্গে আদালতে মামলা আছে। জেলা প্রশাসক বলছেন, নিষেধাজ্ঞার মামলা ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত উন্নয়নমূলক কাজ করা যাবে না।