রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২২ ১৫:৫৭ পিএম
আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২২ ১৭:১৩ পিএম
হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবীর। ছবি : প্রবা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবীর বলেছেন, ঠিকাদারের হাতে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এ হাসপাতালে মধ্যস্বত্বভোগীর কোনো স্থান নেই। হাসপাতালের যেসব বিভাগে টেকনোলজিস্ট, আয়া, ক্লিনার নেই, সেখানে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে। মাস্টার ডিগ্রি পাস শার্ট-প্যান্ট পরে দালালি করবে, এমন লোক নিয়োগ করার দরকার নেই।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে কলেজ মিলনায়তনে বুধবার (১২ অক্টোবর) আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘কর্মচারীদের বেতন সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে দিতে হবে। তাহলে কর্মচারীরা তাদের প্রাপ্যটা পাবে, দালালি বা অন্য কোনো অনৈতিক কাজে ঝুঁকবে না। এজন্য যেকোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হলে আমি দিতে প্রস্তুত। দুই-একজনকে সুবিধা দিতে গিয়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবে, এটা হতে দেওয়া হবে না।’
অধ্যাপক আহমেদুল বলেন, আপনারা সঠিকভাবে কাজ করেন না বলে আপনাদের মানুষ গালি দেয়। যে সকল প্রাইভেট হাসপাতালের লাইসেন্স নাই, যেখানে ওয়ার্ডবয় অপারেশন করে, অ্যানেসথেসিয়া দেয়, সেখানে আমার চিকিৎসক যায় কেন। তাদের দায়-দায়িত্ব কোথায়। অনিবন্ধিত ক্লিনিকগুলোকে তো তারাই বাঁচিয়ে রেখেছে। অথচ সৃষ্টিকর্তার দূত হিসেবে ডাক্তারকে সম্মান করা হয়। অন্য পেশার চেয়ে ডাক্তারি পেশায় সৎপথে থেকে অনেক উপার্জন করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, ‘রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেসব ডিপার্টমেন্টে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে তা চালু করতে হবে। কার্ডিওলজি বিভাগে এখন কয়টা ইকো হয় তা আমি জানি না। হেপাটোলজি উইং আছে অথচ এন্ডোসকপি হয় না। এখানে কেন এসব সেবা দেওয়া হবে না, সবাইকে জবাবদিহিতার মধ্যে আসতে হবে। এ হাসপাতালে সব ধরনের রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। তাহলে কেন রোগীদের ঢাকায় যেতে হয়। কেন তারা কার্ডিয়াক ইমারজেন্সি সার্ভিস পাবে না। কেন রোগী ঢাকায় যেতে রাস্তায় মারা যাবে।’
‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকের প্রতিজ্ঞা করতে হবে কোনো রোগী এখন থেকে ঢাকায় যাবে না। হাসপাতালেই তাদের উন্নতমানের চিকিৎসা প্রদান করা হবে। এ হাসপাতাল নিয়ে সারা দেশে উপহাস আছে। এখানে চিকিৎসক জিম্মি, নার্সরা জিম্মি, তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা কাজ করে না। এখন থেকে হাসপাতালের বাইরে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতে দেওয়া যাবে না। হাসপাতালে রোগীদের শতভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিকে ভুল রোগ নির্ণয়ের ফলে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে করে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। অপরদিকে ভুল চিকিৎসার সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে পার্শ্ববর্তী দেশের দালালরা আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার নেতিবাচক দিক তুলে ধরে রোগীদের অন্য দেশে পাঠিয়ে দেবে। আমরা চাই সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি রেগুলেটেড প্রাইভেট হাসপাতাল থাকুক। যেখানে সঠিক ডায়াগনসিস ও চিকিৎসা হবে। এটি করলে প্রতি বছর বিদেশে চিকিৎসা নিতে দেশের মানুষ যে ৪৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করে, তা দেশেই থেকে যাবে।’
রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. বিমল রায়ের সভাপতিত্বে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উন্নয়ন সংক্রান্ত এ সভায় বক্তব্য রাখেন উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহফুজার রহমান, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ড. শরিফুল হাসানসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অন্য কর্মচারী-নেতারা।
এর আগে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালাল চক্র ও অসাধু কর্মচারীদের আধিপত্যের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়। উত্তরবঙ্গের বৃহৎ এ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে এসে পদে পদে টাকা গুনতে হচ্ছে সেবাপ্রত্যাশীদের। এ থেকে বাদ যায়নি খোদ হাসপাতালের চিকিৎসকের পরিবারও। দালাল চক্র ও অসাধু কর্মচারীদের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে মারধরের শিকার হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার অভিযোগ গেলেও অসাধু কর্মচারীদের হাতে জিম্মি থাকা হাসপাতাল প্রশাসনও তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। এ থেকে পরিত্রাণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে গত ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে হাসপাতাল চত্বরে মানববন্ধন সমাবেশ করেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সর্বস্তরের চিকিৎসকরা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর হাসপাতালের ১৬ কর্মচারী ও ২ অক্টোবর হাসপাতালের উপ-পরিচালকসহ তিন কর্মকর্তাকে বদলি করা।
প্রবা/রাই/এমজে