নজরুল ইসলাম মাহফুজ, বাকেরগঞ্জ (বরিশাল)
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ১০:৪৭ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ২০:৩০ পিএম
বরিশালের বাকেরগঞ্জে জমিদার কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর (নাটু বাবু) জরাজীর্ণ বাড়ি। প্রবা ফটো
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর (নাটুবাবু) জমিদারবাড়িটি অযত্ন ও অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। স্থানীয় একটি চক্র জমিদারবাড়ি এবং এর আশপাশের জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জমিদারের উত্তরাধিকারীরা। তারা বলছেন, ঐতিহাসিক এই বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করুক এবং এর সম্পত্তি সরকার জনকল্যাণে ব্যবহার করুক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে জমিদারবাড়িটি বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর এই বাড়ি ও জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠিত শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (বর্তমানে শহীদ কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়) গড়ে তোলা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। ২৫ মার্চের পর বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল জমিদারবাড়িটি। এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা হতো। উনিশ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত জমিদারির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন পঞ্চম বংশধর নাটুবাবু। তিনি ছিলেন আজীবন বিপ্লবী। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার বাড়িতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ক্যাম্প তৈরি করে এখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতাবিরোধীরা তাকে হত্যা করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ৬ দশমিক ৬৯ একর জমির ওপর গড়ে তোলা বাড়িটির মূল দোতলা ভবনটি সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বাড়িতে ঢোকার মূল ফটকও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ। দোতলা মূল ভবনটিতে বাস করছেন নাটুবাবুর স্ত্রী ছায়া রায় চৌধুরী ও ছেলে বিপ্লব বন্ধু রায় চৌধুরী। বাড়ির ভেতরে বড় একটি দিঘি, একটি পুকুর ও বাগান রয়েছে। এই পরিবারের জমির ওপর শহীদ কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামপুর বাজার, মসজিদ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট, বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধসহ নানান স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
বাকেরগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধে ভুলু বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া তৎকালীন ছাত্রনেতা ও বর্তমানে কৃষক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি খান আলতাফ হোসেন (ভুলু) বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জমিদার নাটুবাবুর বাড়িটি ও তাদের প্রতিষ্ঠিত শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার থেকে শুরু করে আবাসনের সব ব্যবস্থাই করেছিলেন তিনি। যুদ্ধকালীন ১৫ নভেম্বর স্থানীয় রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। সেদিন সম্মুখযুদ্ধে তিন ব্যক্তি শহীদ হন। আর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে ২১ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ওই যুদ্ধে ৩৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা।

নাটুবাবুর স্ত্রী ছায়া রায় চৌধুরী জানান, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর অন্ধকার নেমে আসে জমিদার পরিবারে। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে স্বাধীনতাবিরোধীরা। তারা প্রতিষ্ঠিত হয় স্থানীয় রাজনীতিতে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
নাটুবাবুর ছেলে লন্ডনপ্রবাসী বিপ্লব বন্ধু রায় চৌধুরী জানান, আজও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই জমিদারবাড়িটি সংরক্ষিত হয়নি। বাড়িটি দখল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র ও তাদের সহযোগীরা। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, বাড়িটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রের কোনো সেবামূলক কাজে ব্যবহার করুক। আমরা সব সম্পত্তি সেবামূলক কাজে দান করতেও প্রস্তুত।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজল চন্দ্র শীল জানান, কেউ ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে দান করতে চাইলে আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে আবেদন করতে হবে।
বাকেরগঞ্জ থানার ওসি মাসুদুর রহমান জানান, জমিদার নাটুবাবুর বাড়ি, জমিজমা দখলের কেউ চেষ্টা করলে অভিযোগ সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।