চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৩ ১৯:০১ পিএম
আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৩ ১৯:২৯ পিএম
সাম্প্রতিক বন্যায় ডুবে যায় সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম। ফাইল ফটো
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বন্যায় ২৮ কোটি টাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান। ১ হাজার ২৮০ হেক্টর জমির প্রায় ১২ কোটি ২৮ লাখ টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। এর পরই রয়েছে শাক-সবজি। ২২০ হেক্টর জমির ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার শাক-সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অফিস থেকে তৈরি করা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, বন্যায় সাতকানিয়ায় এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। কৃষির পাশাপাশি একই সময় বন্যার পানিতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সড়ক ভেঙে যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পানিতে ডুবেছে শত শত পোল্ট্রি খামার। ভেসে গেছে মাছ চাষের পুকুর।
সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ৩ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) দুপুর থেকে চট্টগ্রামে বৃষ্টি শুরু হয়। ওই দিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে চলা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের নিচু এলাকায় পানি জমতে শুরু করে। পরদিন শুক্রবার থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হলে জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে থাকে।
সবশেষ শনি ও রবিবারের বৃষ্টিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়। বৃষ্টির পানিতে সাতকানিয়ার ৯টি ইউনিয়নসহ চন্দনাইশের দক্ষিণ হাশিমপুর, দোহাজারী ইউনিয়ন, দোহাজারী পৌরসভার জামিজুরি এলাকাসহ বেশ কিছু এলাকার ঘরবাড়ি সাত থেকে আট ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। চার দিন স্থায়ী হওয়া এই বন্যায় এসব এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি ফসলি জমিসহ সব নষ্ট হয়ে যায়। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চন্দনাইশের এই দুই ইউনিয়নের এক লাখ মানুষ।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বন্যায় ২ হাজার ৮৬৩ হেক্টর জমিতে থাকা ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে দুর্যোগকবলিত জমি ছিল ২ হাজার ১৬৪ হেক্টর। ওইসব জমির মধ্যে ১ হাজার ৭৪২ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪২২ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব মিলিয়ে সাতকানিয়ায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’
সাতকানিয়া মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ৩ হাজার পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত শর্মা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘খামারিদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে খামারিদের সহায়তা করা হবে।’
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে কেঁওচিয়া, বাজালিয়া, ছদাহা, ধর্মপুর ও পুরানগড় এলাকায়। এ ছাড়া বন্যায় দক্ষিণ ঢেমশা, সাতকানিয়া সদর, কালিয়াইশ, নলুয়া, খাগরিয়া, আমিলাইষ, চরতি, এওচিয়া, কাঞ্চনা, মাদার্শা, সোনাকানিয়া, পশ্চিম ঢেমশায় ও পৌরসভায় অবস্থিতি অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খামারিরা জানান, সরকারিভাবে ক্ষতির যে পরিমাণ বলা হচ্ছে বাস্তবে এর চেয়ে চারগুণ বেশি।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খামারি মো. হাবিবুর রহমান জানান, তার ৩০০ একর মাছের প্রজেক্ট ডুবে সব মাছ ভেসে গেছে। যেখানে তেলাপিয়া, পাঙাশ, কাতল, রুই ও অন্যান্য জাতের মাছ ছিল। পোনা উৎপাদনের জন্য ছিল হ্যাচারি। সেটাও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া কেরানিহাট ঢেমশা সড়কে মাছের খাদ্য উৎপাদনের মিল রয়েছে। তৈরি করা খাবার ও কাঁচামাল নষ্ট হয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সব মিলে বন্যায় তার প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ’বন্যায় আমার ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ধার-দেনা করে পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করেছিলাম। বন্যায় সবগুলো পুকুর ডুবে মাছগুলো ভেসে গেছে। এখন সরকারি সহযোগিতা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোনো সুযোগ নেই।’