এন. এইচ পারভেজ, চিলমারী (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৩ ১২:১৫ পিএম
আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৩ ১৬:৫৯ পিএম
কুড়িগ্রামের চিলমারী নৌবন্দর। প্রবা ফটো
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণার সাত বছরেও দৃশ্যমান হয়নি কুড়িগ্রামের চিলমারী নৌবন্দরের আধুনিকায়নের কাজ। বর্তমান সরকারের মেয়াদ যেহেতু শেষ হওয়ার পথে তাই সংগতকারণেই এটি আধুনিকভাবে গড়ে তোলা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সরকারপ্রধানের ঘোষণার পর এতদিনেও দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়ায় স্থানীয়রা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় কার্ডের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজিতে চাল বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করতে এসেছিলেন। সেই দিন উপজেলার থানাহাট এ.ইউ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে চাল বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে চিলমারী নৌবন্দরের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর চিলমারীর মানুষ নতুন করে এই প্রাচীন বন্দরটিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এরপর থেকে হচ্ছেÑ হবে করে ৬ বছর ১০ মাস পেরিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত চিলমারী নৌবন্দরে দৃশ্যমান কোনো অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
মরহুম শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমেদের গাওয়া ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারী বন্দরে রে’ গানটি চিলমারী নৌবন্দরকে বিশেষভাবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। ব্রিটিশ আমলে চিলমারী বন্দরটি বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহন করত। তখন কলকাতা থেকে চিলমারী হয়ে দুটি জাহাজ যাত্রী ও পণ্য নিয়ে আসামের ডিব্রুগড় ও গৌহাটি যাতায়াত করত। ১৫৮০ সালে প্রাচীন নৌবন্দরটি সর্ব প্রথম ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়।
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ তাদের বাস্তুভিটা হারিয়েছে। অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পথের ভিখিরি হয়েছে। বর্তমানে চিলমারী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩টি ইউনিয়ন পুরোপুরি ব্রহ্মপুত্রের বুকে বিলীন। বাকি তিনটি ইউনিয়নের অর্ধেকেরও বেশি অংশ ব্রহ্মপুত্র গ্রাস করে ক্রমাগত চিলমারীর শেষ অংশটুকু গিলে খাওয়ার পথে এগোচ্ছিল।
১৯৯৩ সালের ১৭ জুলাই চিলমারী বন্দর নদী ভাঙন প্রতিরোধ আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে নদী প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়। দীর্ঘ দেড় যুগ আন্দোলনের পর সফলতা আসে। ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পঞ্চম বৈঠকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চিলমারী উপজেলার বৈরাগীর হাট ও চিলমারী বন্দর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা ফেজ-১ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ডান তীর প্রতিরক্ষা প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। ৯৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশের কাজ ২০০৯ সালের জুনে শেষ হয়। বাকি প্রকল্পগুলো ২০১৭ সালে শেষ হয়। ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে চিলমারীবাসীর প্রাণের দাবি পূরণ হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার পর চিলমারী উপজেলার বাকি অংশ রক্ষা পায়।
২০১৬ সালে শেখ হাসিনার ঘোষণার পর নৌবন্দরের নিয়ন্ত্রণাধীন চিলমারীকে নদীবন্দর হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। পাশাপাশি এ নদীবন্দরের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের প্রকল্পে ২৩৫ দশমিক ৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় একনেক।
এ ব্যাপারে চিলমারী প্রেস ক্লাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম সাবু বলেন, চিলমারী নৌবন্দরটিকে আধুনিকায়নের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর ৭ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক চিলমারী নৌবন্দর নির্মাণে দৃশ্যমান কিছু এখনও দেখা যাচ্ছে না। সরকারের মেয়াদও শেষের পথে। আদৌ আধুনিক চিলমারী নৌবন্দর কি গড়ে উঠবে?
চিলমারী বিএম কলেজের সহকারী অধ্যাপক জিয়াউর রহমান জিয়া হতাশা প্রকাশ করে বলেন, জানি না, আধুনিক চিলমারী নৌবন্দর নির্মাণের ভবিষ্যৎ কী?
গোলাম হাবিব মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম সরদার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর অনেক আশা নিয়ে চিলমারীবাসী অপেক্ষা করছে। এখনও আধুনিক চিলমারী নৌবন্দরের স্বপ্ন দেখছে। কবে নাগাদ তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হবে, সেটা তারা জানে না।
চিলমারী নদীবন্দর নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা মোবাইলে এ প্রতিনিধিকে বলেন, বন্দরের জন্য ১০ একর জমি অধিগ্রহণ করার কথা। এরই মধ্যে আড়াই একর জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। বাকি সাড়ে সাত একর জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রক্রিয়াধীন। বাকি জমি অধিগ্রহণ করা হয়ে গেলেই দৃশ্যমান অবকাঠামোগত কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি আরও জানান, জমি অধিগ্রহণসহ সব কম্পোনেন্ট তৈরির জন্য ২৩৫ কোটি টাকা সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কাজ শুরু হলে দেড়-দুই বছরের মধ্যেই শেষ হবে।