মৌলভীবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ২০:৪০ পিএম
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩ ২১:১৬ পিএম
কুলাউড়ার কর্মধায় একটি জঙ্গি আস্তানায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কর্মধায় আরও একটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। মঙ্গলবার (১৫ আগস্ট) ১৩ নম্বর কর্মধা ইউনিয়নের কালা পাহাড়ের টিলায় ওই আস্তানা পাওয়ার কথা জানায় তারা। এ সময় আস্তানার পাশে মাটিতে পুতে রাখা ৫-৬ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য ও ১৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
এর আগে সোমবার স্থানীয়দের সহায়তায় জঙ্গি সন্দেহে ১৭ জনকে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ও ৯৬টি ডেটোনেটর পাওয়া যায়, যার মধ্যে কয়েকটি সংযুক্ত ছিল।
বিকাল সাড়ে ৫টায় মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ লাইনের কনফারেন্স রুমে ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান সিটিটিসিপ্রধান মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সোমবার স্থানীয়দের সহায়তায় ১৭ জনকে আটক করার পর আমরা সারা রাত ওই ১৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা নতুন এই আস্তানার ঠিকানাসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে আটক ১৭ জনের মধ্যে তিনজনকে নিয়ে আমরা পাহাড়ে অভিযান শুরু করি। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা পর আমরা ছোট-বড় প্রায় ২০টি পাহাড় অতিক্রম করে লক্ষ্যে পৌঁছাই। ওই নতুন আস্তানায় তিনটি ঘর। সোমবার আটক জামিলের দেখানো মতে, ওই তিনটি ঘরের মধ্যে দুটি ঘরের পাশে মাটির নিচে পুতে রাখা ৫-৬ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য ও ১৪ রাউন্ড পিস্তলের গুলি উদ্ধার করি।’
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘তারা (জঙ্গি) নতুন এ আস্তানাকে ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করত। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অথবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য মাথায় নিয়ে তারা সুউচ্চ পাহাড় থেকে সমতলে চলে আসছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘’আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের পর জানা যাবে তাদের মধ্যে ‘ইমাম মাহমুদের কাফেলা’র প্রধান আছেন কি না। তদন্ত শেষ হলে সবকিছু জানানো হবে।’’
আটক ১৭ জন হলেন, নাটোরের বাগাতিপাড়ার গাঁওপাড়া গ্রামের জুয়েল মাহমুদ, সিরাজগঞ্জ সদরের পুড়াবাড়ি গ্রামের সোহেল তানভীর রানা, কক্সবাজারের রামুর দক্ষিণ শ্রীকুল গ্রামের সাদমান আরেফিন ফাহিম, একই উপজেলার মধ্যম মংনোয়া গ্রামের ইমতেজার হাসসাত নাবীব, যশোর সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া গ্রামের ফাহিম খান, পাবনার আতাইকুলার আতাইকুলা গ্রামের মামুন ইসলাম, গাইবান্ধার গোবিন্দবক্স উপজেলার চাদপাড়া গ্রামের রাহাত মণ্ডল, জামালপুরের বকশীগঞ্জের দত্তেরচর গ্রামের সোলাইমান মিয়া, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গোলা কান্দাইল গ্রামের আরিফুল ইসলাম, বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশিপুর গ্রামের আশিকুল ইসলাম, পাবনার আতাইকুলা গ্রামের মামুন ইসলাম, ঝিনাইদহের সদর উপজেলার ছয়াইল গ্রামের তানভীর রানা, সাতক্ষীরার তালার দক্ষিণ নলতা গ্রামের জুয়েল শেখ, পাবনার আতাইকুলার কয়জুড়ি শ্রীপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম, একই জেলার সাথিয়া উপজেলার দারামোদহা গ্রামের আবির হোসেন, মাদারিপুরের সদর উপজেলার পূর্ব চিয়াইপাড়া গ্রামের মেহেদী হাসান মুন্না এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির মুমিনপুর গ্রামের কোয়েল হোসেন।
যেভাবে গড়ে ওঠে এই আস্তানা : পূর্ব টাট্টিউলি কুলাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ঘেরা একটি নিভৃত গ্রাম। ওই এলাকার অধিকাংশ জমিই খাস খতিয়ানভুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে জমিগুলোর দখলস্বত্ব বেচাকেনা হয়। স্থানীয়রা জানান, ওই পাহাড়ি এলাকার ৫০ শতাংশ জমির দখলসূত্রে মালিক ওই গ্রামের রাশিদ মিয়া। তিনি কাতারপ্রবাসী। প্রায় দুই মাস পূর্বে ৭ লাখ টাকায় ওই জমিটির দখলস্বত্ব কিনে নেন জামিল মিয়া নামের এক ব্যক্তি। জমিটির দখলস্বত্ব কেনার সময় জামিল মিয়া গ্রামবাসীদের জানিয়েছিলেন, তার বাড়ি বগুড়ায়। তিনি দাবি করেছিলেন, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা এখানে এসেছেন এবং উঁচু পাহাড়ে বসতিস্থাপন করে বসবাস করবেন। জামিল মিয়া এখানে টিন দিয়ে তিনটি ছাপড়া একচালা অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেন। নড়বড়ে ওই ঘরগুলোতে শিশু-নারীসহ ১৫ থেকে ১৬ জন বসবাস শুরু করেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এ ঘরের নারীরা পর্দার সঙ্গে চলাফেরা করতেন এবং পুরুষরা নিজেরা নামাজে যেতেন এবং গ্রামের অন্যদের নামাজে যাওয়ার জন্য এবং ধর্মের পথে চলার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন।
গ্রামের বাসিন্দা মো. ইয়াকুব আলীম, আব্দুর রাজ্জাকরা বলেন, ‘প্রথমে দুটি পরিবার এ গ্রামে এলেও বাড়ি করার এক মাস পর থেকে বহিরাগত আরও প্রায় ১০-১২ জন লোক ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন।’
যে টিলায় জঙ্গি আস্তানা ছিল ওই টিলার পাশেই বসবাস করেন রেজিয়া বেগম নামের এক গৃহবধূ। তিনি বলেন, ‘দুই মাস আগে আৎকা তারা গ্রামে আইলো। টিলা কাটিয়া টিনের ঘর বানাইল। ওই বাড়িত তারা মাটিত ঘুমাইতেন। বেইট্টাইন (নারী) হকল পর্দা করতো। তারা কিতা সব বইপত্র পড়তো আর কোরআন শরীফ পড়তো।’
কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুহিবুল ইসলাম আজাদ বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের পূর্ব টাট্টিউলি গ্রামের বাইশালীবাড়ি নামক পাহাড়ি এলাকায় টিলার ওপরে প্রায় দুই মাস ধরে কয়েকটি পরিবার বসবাস করছে। তারা কী কাজ করত তা-ও এলাকার কেউ জানে না।’
যেভাবে আটক হলেন ওই ১৭ জন : সোমবার সকালে পূর্ব টাট্টিউলি গ্রামের আছকরাবাদ চা-বাগানের প্রবেশপথে সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডে এসে ১৭ ব্যক্তি রোগী ও যাত্রীবেশে ভাড়া করেন চারটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। তারা রোগী নিয়ে মৌলভীবাজার যাবেন বলে চালকদের জানান। তাদের কথাবার্তায় চালকদের সন্দেহ হয়, তারা স্থানীয় নন। এ ছাড়া তাদের পরিধেয় কাপড়-চোপড় কাদাযুক্ত হওয়ায় এবং পায়ে জুতা না থাকায় অটোরিকশাচালকদের মনে সন্দেহ হয়। একপর্যায়ে চালকরা রবিরবাজার-কর্মধা সিএনজি অটোরিকশা লাইনের সভাপতি মো. জামাল মিয়াকে বিষয়টি জানান। তিনি বিষয়টি ফোনে জানান স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. দরছ মিয়াকে। তার পরামর্শে চারটি সিএনজি অটোরিকশার সবাইকে নেওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। সেখানে জনপ্রতিনিধি ও গ্রামপুলিশের হাতে তাদের তুলে দেওয়া হয়। পরে থানা-পুলিশ, ইউপি চেয়ারম্যানসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আসেন। পরে তাদের আটক করা হয়।
রবিরবাজার-কর্মধা সিএনজি অটোরিকশা লাইনের সভাপতি মো. জামাল মিয়া বলেন, ‘আমরার চার ড্রাইভার টাকার লোভ করছে না। তারা যত কইত ভাড়া ততই দিত। দুদিন আগে এলাকা থাকি জঙ্গি ধরা অইছে। এর লাগি আমরা সন্দেহ অইছে ওই ১৭ জনের উপরে। আমরা এলাকার কথা, দেশের কথা আর মাইনষের কথা চিন্তা করিয়া তারারে ধরাই দিছি।’
এর আগে একই গ্রামের আরেকটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে শনিবার ১০ জনকে আটক করা হয়। এর মধ্যে চারজন পুরুষ ও ছয়জন নারী। তাদের সঙ্গে তিন শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে তল্লাশি চালিয়ে তিন কেজি পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য, ৫০টি ডেটোনেট, কয়েক বস্তা জিহাদি বই, নগদ ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা, প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত পুলিশ বুট ও বক্সিং ব্যাগসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সিটিটিসি।