কুড়িগ্রাম প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৩ ২২:২৯ পিএম
কুড়িগ্রামে তৃতীয় দফা বন্যার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও শুরু হয়েছে বন্যা। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৪০ হাজার মানুষ। সোমবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় তিস্তার পানির বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও ধরলার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। তবে এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের তিনটি চরে হঠাৎ দেখা দিয়েছে ডায়রিয়া, জ্বর, সর্দি ও কাশি। প্রায় পরিবারে কয়েকজন করে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন শয্যাশায়ী।
বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিম কাজ করার কথা থাকলেও স্বাস্থ্য সেবা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ দুর্গম প্রান্তিক পর্যায়ের চরাঞ্চলের এসব মানুষ।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৫২ সেন্টিমিটার, ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ৫৬ সেন্টিমিটার, দুধকুমর নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উলিপুর উপজেলার মুসার চরে কৃষক মতিয়ার রহমানের বাড়িসহ পুরো গ্রামবাসী পানিবন্দি। নৌকায় চলছে জীবন পরিচালনার সব কার্যক্রম। একই পরিস্থিতি পাশের গ্রাম বালাডোবা এবং মশালের চরে। বন্যার পানি আসলে ডুবে যায় টিউবওয়েল ও টয়লেট। ফলে এখানকার মানুষকে নৌকায় খাবার, ঘুম এবং প্রকৃতির চাপ সারতে হয়। গত চার দিন থেকে এসব গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে জীবন যাপন করছে।
মুসার চরের কৃষক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘গত দু’দিন থেকে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে হঠাৎ জ্বর ও ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে আক্রান্ত হয়ে এখন বিছানায়। বন্যার সময় তো দূরের কথা শুকনো মৌসুমেও এই গ্রামে গত তিন বছরে কোন স্বাস্থ্যকর্মী আসেনি, আমরা এখানকার মানুষ আসলে হতভাগা।’
বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের দুই নম্বার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তসির উদ্দিন বলেন, ‘বন্যায় ব্যাপারীপাড়া ও বিন্দুর চরে প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে জ্বর-সর্দি। পানির কারণে মানুষ শহরে যেতে পারে না, যার কারণে চিকিৎসাও নিতে পাচ্ছে না।’
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য দক্ষিণ কালির আলগা গ্রামের বাসিন্দা আসাদ আলী বলেন, ‘বন্যার কারণে আমাদের গ্রামে অস্বাভাবিকভাবে দেখা দিয়েছে জ্বর, সর্দি ও কাশি। সঙ্গে কিছু কিছু পরিবারে ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। ফ্লাজিল ও প্যারাসিটামল খেয়েই বাড়িতে সবাই চিকিৎসা নিচ্ছে।’
কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. মঞ্জুর-এ মোর্শেদ জানান, ‘কুড়িগ্রাম জেলার বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা প্রদানে আমাদের ৮৫টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এ ছাড়া বন্যাকবলিত ৪৫টি কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা চলমান রয়েছে। জেলায় ৮৫টি মেডিকেল টিমের মাধ্যমে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যালাইন ও জরুরি ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোডের্র নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ্ আল মামুন বলেন, ‘ইতোমধ্যে সবকটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চরের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাকী নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।’
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ জানান, ‘বন্যার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে দশ লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা, ৩ হাজার ৭০০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৩৮৭ মেট্রিকটন চাল ও খাবার স্যালাইন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে আপদকালীন দুর্যোগ মোকাবিলায় ৭৩ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জরুরি মুহূর্তে এগুলো বিতরণ করা হবে।’