প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২২ ২২:১৯ পিএম
আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২২ ১১:২০ এএম
বিভিন্ন বিচ্ছন্ন সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় পার্বত্য অঞ্চলে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নতুন উগ্রবাদী সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সদস্যরা। হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম থেকে বেরিয়ে একটি গ্রুপ এখানে যুক্ত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য তৈরি হচ্ছে।
শারক্বীয়ার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার সংবাদ সম্মেলনে এমন খবর দেন র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে হয় এ সংবাদ সম্মেলন।
কমান্ডার মঈন বলেন, জঙ্গিসম্পৃক্ততায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় দেড় মাস থেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ ছিলেন ৬৭ জন। এদের মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। এখনও নিরুদ্দেশ রয়েছেন ৫৫ জন। তাদের মধ্যে ৩৮ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে।
এর আগে রবিবার মধ্যরাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও কেরানীগঞ্জে অভিযান চালিয়ে কুমিল্লা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ‘জঙ্গিসম্পৃক্ততায়’ বাড়ি ছেড়ে যাওয়া তিন যুবকসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। র্যাব জানায়, এদের মধ্যে সংগঠনের দাওয়াতি ও অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী হাবিবুল্লাহ হাবিবও রয়েছেন। তিনি জঙ্গিসম্পৃক্ততায় বাড়ি ছেড়ে যাওয়া কিশোর-যুবদের সঙ্গে জড়িত বলে র্যাবের কাছে তথ্য রয়েছে। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন— নেয়ামত উল্লাহ, মো. হোসাইন, রাকিব হাসনাত নিলয় ও সাইফুল ইসলাম রনি।
কমান্ডার মঈন বলেন, ২৩ আগস্ট কুমিল্লা থেকে আট তরুণ নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় ২৫ আগস্ট কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় জিডি হয়। এতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায় র্যাব। তদন্তকালে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা ঘর ছেড়েছেন। এ ছাড়া ৬ সেপ্টেম্বর ঘর ছাড়ার প্রস্তুতিকালে চার তরুণকে হেফাজতে নিয়ে পরিবারে ফিরিয়ে দেয় র্যাব।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ আট তরুণের মধ্যে শারতাজ ইসলাম নিলয় ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কল্যাণপুরের বাড়িতে ফিরে আসেন। নিলয়ের কাছে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তারা উগ্রবাদী সংগঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার রাতে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, হোসাইন এক বছর আগে, সাইফুল দেড় মাস আগে ও রাকিব দুই মাস আগে নিখোঁজ হন। তাদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ নিতে পটুয়াখালী, ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিরুদ্দেশ তরুণের সংখ্যা ৫০-এর অধিক। যারা প্রায় দেড় মাস থেকে দুই বছরের অধিক সময় নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ ছিলেন বলে র্যাব জেনেছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের পরিবার জানে তারা চাকরির জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন এবং পরিবারকে নিয়মিত অর্থ দিচ্ছেন। প্রাথমিকভাবে সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে তাদের নাম ও ঠিকানা পাওয়া গেছে। ক্ষেত্রবিশেষ নাম ও ঠিকানায় কিছুটা তারতম্য থাকতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় দুর্গম অঞ্চলে আত্মগোপনে থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এই তরুণরা, যারা হিজরতে গিয়েছেন বলে কথিত আছে। প্রাথমিকভাবে প্রাপ্ত এ তথ্যগুলো দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন বাহিনীকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্মিলিত অভিযান চলছে।
র্যাব জানায়, হাবিবুল্লাহ কুমিল্লার কুবা মসজিদে নামাজ পড়াতেন। এ ছাড়া তিনি মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। তিনি ২০২০ সালে নেয়ামত উল্লাহর মাধ্যমে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ (পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দের জামাতুল আনসার) সংগঠনটিতে যুক্ত হন। সংগঠনটির অন্যতম অর্থ সরবরাহকারী ছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বে কুমিল্লা অঞ্চলে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালিত হতো। হাবিবুল্লাহ সংগঠনের জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করে উগ্রবাদী কার্যক্রমে সরবরাহ করতেন। পার্বত্য অঞ্চলের নাইক্ষ্যংছড়িতে তিনি প্রায় দুই বছর একটি মাদরাসা পরিচালনা করেন। পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্র সংগ্রহ করে নিজের মাদরাসায় রাখতেন। ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণে পাঠিয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে।
নেয়ামত উল্লাহ কুমিল্লার একটি মহিলা মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। তিনি ২০১৯ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে সংগঠনে যুক্ত হন। সংগঠনের দাওয়াতি কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পাশাপাশি নিরুদ্দেশ তরুণদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। বাড়ি ছেড়ে যাওয়া সদস্যদের তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে আশ্রয় দিতেন।
হোসাইন পেশায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান ও রংমিস্ত্রি। স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হন তিনি। এক বছর সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
রাকিব কুরিয়ার সার্ভিসে ডেলিভারি বয়ের কাজ করতেন। তিনি হোসাইনের মাধ্যমে সংগঠনে জড়িত হন। উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রায় দুই মাস আগে নিরুদ্দেশ হন রাকিব। সাইফুল পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। গত আগস্টে নোয়াখালী থেকে জঙ্গিবাদে উদ্বুব্ধ হয়ে নিরুদ্দেশ হন তিনি। নোয়াখালীর এক ব্যক্তির মাধ্যমে উগ্রবাদী এই সংগঠনে জড়িত হন সাইফুল।
কমান্ডার মঈন বলেন, নিখোঁজ তরুণদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ দিতে পটুয়াখালী, ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। সেখানে বিভিন্ন সেইফ হাউসে রেখে এবং পটুয়াখালীর বিভিন্ন ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে উপকূলীয় চর এলাকায় শারীরিক কসরত ও জঙ্গিবাদবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এ ছাড়া আত্মগোপনে থাকার কৌশল হিসেবে তাদের রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ানসহ বিভিন্ন পেশার কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
মঈন বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের এই তরুণরা প্রায় দেড় মাস থেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিরুদ্দেশ বা নিখোঁজ ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের পরিবার জানে তারা চাকরির জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন। পরিবারকে নিয়মিত অর্থ পাঠাতেন। প্রাথমিকভাবে সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলে আত্মগোপনে থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন তারা এবং সংগঠনটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
১৮ জেলার ৫৫ তরুণ নিরুদ্দেশ
৬৭ জনের মধ্যে যে ৫৫ জন এখনও নিরুদ্দেশ, তারা অন্তত ১৮ জেলার বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন কমান্ডার মঈন। তিনি বলেন, এসব তরুণ নতুন জঙ্গি সংগঠনের হয়ে হিজরতে রয়েছেন। যারা নিখোঁজ থেকে জঙ্গি সংগঠনে কাজ করছেন তারা হিজরতে গিয়েছেন বলে কথিত। তারা যেকোনো ধরনের নাশকতা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে র্যাব।
নিরুদ্দেশ তরুণদের মধ্যে রয়েছেন— নারায়ণগঞ্জের চার, নেত্রকোনার এক, নোয়াখালীর এক, পটুয়াখালীর ছয়, ফরিদপুরের দুই, বরিশালের তিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক, ময়মনসিংহের এক, মাগুরার এক, মাদারীপুরের দুই, সিলেটের সাত, সুনামগঞ্জের এক, কুমিল্লার ১৫, খুলনার এক, চাঁদপুরের এক, ঝালকাঠির দুই, ঝিনাইদহের এক, টাঙ্গাইলের এক ও ঢাকার চারজন।
প্রবা/টিকে/জেও