সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০২ পিএম
আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০২ পিএম
খানাখন্দে পানি জমে চলাচলের অযোগ্য কিশোরগঞ্জ শহরের পুরাতন দেওয়ানি আদালত থেকে কাচারি বাজার সড়ক। প্রবা ফটো
কিশোরগঞ্জ পৌর শহরের সত্তরের দশকের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন নাট্যশিল্পী আলজুস ভূঞা। সম্প্রতি কর্মস্থল ঢাকা থেকে অনেক দিন পর নিজ শহরে বেড়াতে আসেন। কিন্তু শহরের খানাখন্দে ভরা রাস্তা দেখে হতাশা প্রকাশ করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সত্তর-আশি ও নব্বইয়ের দশকেও শহরে রাস্তাঘাটের অবস্থা এমন শোচনীয় ছিল না। চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে সড়কগুলো।’ শুধু আলজুস ভূঞা নন, ১৫৪ বছরের প্রাচীন পৌরসভাটির অধিকাংশ সড়ক বেহাল হওয়ায় একইভাবে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভায় ১০টি প্রধান সড়কসহ শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় ৬৭টি সড়ক রয়েছে। কিন্তু সরেজমিন দেখে ও শহরের বিভিন্ন বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব সড়কের ৫২টিই বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পিচ-খোয়া উঠে গেছে। এখন সেখানে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় খানাখন্দ। এবড়োখেবড়ো সড়কে চলাচলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শহরের বাসিন্দারা। বৃষ্টি হলে পানি জমে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। কিছু কিছু সড়কে হাঁটু সমান পানি জমে। তখন যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, হাঁটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। যাতায়াত করতে গিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পৌরসভার প্রায় আড়াই লাখ বাসিন্দাকে।
বিভিন্ন সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত তিন দশকে কিশোরগঞ্জ পৌরসভায় সড়ক উন্নয়নের বেশ কিছু কাজ হয়েছে। উন্নয়ন কাজে ১২০ কোটিরও বেশি টাকা খরচ করা হয়েছে। কিন্তু সংস্কারের তিন বছরের মধ্যে আবার একই অবস্থা হয়েছে। সড়ক সংস্কারে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ পৌরবাসীর। এ ছাড়া সড়কের পাশে প্রয়োজনীয় নালা না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়।
সম্প্রতি শহরের অন্যতম কাচারি বাজার-বুলবুল ভিলা পুকুর, পুরাতন দেওয়ানি আদালত থেকে সরকারি বালক বিদ্যালয়, নীলগঞ্জ মোড় থেকে শহীদী মসজিদ, বয়লা এলাকার পাঁচটি সড়ক, রেল গোদাম-ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ, নিউটাউন-কাঠগোলার মোড় ও কাটাখালী সড়ক, চর শোলাকিয়া ও নগুয়া এলাকার ৭টি সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, এসব সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে হাঁটু পানি জমে গিয়েছে। ফলে যান ও লোক চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া শোলাকিয়া, বত্রিশ ও গাইটাল এলাকার অলিগলির ৩০টি সড়কও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এরপরও মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। বেগম রোকেয়া সড়ক, কলেজ-ফিশারী লিংক রোড, রাকুয়াইল রোড়, নগুয়া, হয়বতনগর রাকুয়াইল, ফিশারী সড়ক, নগুয়া বটতলা, পুরাতন কোর্ট রোড, সরকারি মহিলা কলেজ সড়কের বেহাল দশার কারণে রিকশায় যেতে কয়েকবার নামতে হয়।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি জুয়েল বলেন, শহরের সড়কগুলোর দুরবস্থা দেখে এটা দেড়শ বছরের প্রাচীন ও দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভা বলে মনে হয় না। গত ২০ বছরে সড়ক উন্নয়নে অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু দুয়েক বছরের মধ্যে সব সড়ক আবার খানাখন্দে ভরে গেছে। নিম্নমানের কাজ এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় এ অবস্থা হয়েছে। তাই সড়ক সংস্কারের আগে নালার কাজ করা জরুরি। অন্যথায় সংস্কার কিংবা উন্নয়ন করে কোনো লাভ নেই।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক দশকে বেশ কয়েকটি সড়কের সংস্কার করা হয়েছে। এসব কাজে পৌরসভার জনপ্রতিনিধি কিংবা তাদের আত্মীয়-স্বজন সরাসরি যুক্ত থেকে নিম্নমানের কাজ করেছে। এক মাসের কাজ ৮-৯ মাস সময় নিয়ে করেছে। এ ছাড়া নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় তিন বছরের মধ্যে সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বেশিরভাগ রাস্তায় পরিকল্পিত নালা নেই। যেগুলোতে আছে সেগুলোও সচল নয়। শহরের ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে নরসুন্দা নদী। সহজেই নালাগুলোর গন্তব্য সেখানে ফেলা যেত। কিন্তু তা করা হয়নি। আর নদীটি বর্তমানে ভরাট হয়ে মরে নিজেই একটি নালায় পরিণত হয়েছে।
নগুয়া এলাকার বাসিন্দা এনামুল হক জানান, শোলাকিয়া, চরশোলাকিয়া এলাকার তিনটি প্রধান সড়ক, ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ সড়ক, নিউটাউন-কাঠগোলা, নগুয়া সড়কের অবস্থা বেহাল। এসব সড়কে ভেঙে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি জমে। তাই শিক্ষার্থীদের এক কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প পথে গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ, আরজত আতরজান উচ্চবিদ্যালয়, এসভি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে। তাদের প্রতিদিনই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সড়কের বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করে কাউন্সিলর ইসমাইল হোসেন ইদু বলেন, পৌরসভার আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ঠিক ৫২টি সড়ক চলাচলের অযোগ্য তেমনটা নয়। ২৪-২৫টি সড়কের অবস্থা খারাপÑ এ কথা সত্য। এর মধ্যে বেশ কিছু সড়কের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এসব সড়ক সংস্কারে কোনো অবস্থাতেই নিম্নমানের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে প্রশাসন, ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ এলাকাবাসীর সহযোগিতা নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ বলেন, ‘শহরের সব সড়ক মেরামত ও সংস্কার করতে ১০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। পৌরসভার আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। অনেক সময় কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার বা দাতা সংস্থা বিশেষ বরাদ্দ দিলে অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। তবে এবার থেকে অপরিকল্পিতভাবে নালা ও সড়ক নির্মাণ এবং নিম্নমানের কাজের বিষয়ে কঠোর নজরদারি করা হবে।’