সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২২ ১৬:১৩ পিএম
আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২২ ১৬:১৯ পিএম
কিশোরগঞ্জে শরতের হাওর। ছবি : প্রবা
নৌকাডুবিতে মৃত্যুসহ বিভিন্ন কারণে কিশোরগঞ্জের হাওরে পর্যটকদের আনাগোনা কমে গেছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন এ অঞ্চলের হোটেল-রিসোর্ট-নৌকাসহ বিভিন্ন খাতের পর্যটনজীবীরা। কয়েক মাস ধরে বেকার জীবন যাপন করছেন অনেকে।
করিমগঞ্জ উপজেলার নয়াহাটি গ্রামের রাসেল মিয়ার কর্মকেন্দ্র তার বাড়ির কাছেই, বালিখলা ঘাট। এখান থেকে তিনি তার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পর্যটক তুলে ঘুরিয়ে আনেন হাওর জলে। কিন্তু এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তার কপালে।
রাসেল মিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিবছর হাওরে শরৎ আসে মোহনীয় সৌন্দর্য নিয়ে। সেই সৌন্দর্য দেখতে এ সময় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিড় করত। এ বছর পর্যটকদের আকাল দেখা দিয়েছে। এলাকার বিভিন্ন পেশার কয়েক হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক দিনের ছুটিতে কক্সবাজার পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে লাখ পর্যটকের ভিড়ের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। এর হাওয়া হাওরেও লাগার কথা। সে রকমই আশা করেছিলেন এখানকার পর্যটনজীবীরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওরের দ্বার হিসেবে পরিচিত চামড়াঘাট নৌবন্দর, বালিখলা ঘাট ও নিকলী বেড়িবাঁধে কয়েকশ ইঞ্জিনচালিত নৌকা অলস সময় কাটাচ্ছে। হাওরের নিকলী, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামে পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শতাধিক হোটেল-রেস্তোরাঁয় খদ্দের নেই। দুপুর-বিকেল কিংবা রাতের খাবার খেতে লোকজনের ভিড় নেই। এসব রেস্তোরাঁর চুলায় প্রায় দিনই আগুন জ্বলে না বলে তারা জানান ।
হোটেল মালিকরা জানান, সম্প্রতি পর্যটকদের সংখ্যা ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। তারা মালিকরা চোখে অন্ধকার দেখছেন। কারণ সামান্য পরিমাণ রান্না করা খাবার অবিক্রিত থাকছে। এমন অবস্থায় পর্যটনের সাথে জড়িত কয়েক হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে।
মিঠামইন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ কামালের রিসোর্টের নাম হাওর রিসোর্ট।
শরীফ কামাল বলেন, ‘অনেক আশা করে রিসোর্টটি করেচি। আড়াই মাস আগে উদ্বোধন করেছি। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা এবার আশংকাজনক হারে কমে গেছে। রিসোর্টের অধিকাংশ কক্ষ খালি থাকে।
‘এ এলাকার রিসোর্ট মালিক, হোটেল ব্যবসায়ী, নৌকার মাঝি-মাল্লাসহ বিভিন্ন যানের চালক ও মালিকরা বিপাকে পড়েছেন। হাওরের নানা পেশার মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে আর্থিক সমস্যায় আছেন। এ অবস্থায় হাওরে ভ্রমণকারীদের আগ্রহী করে তুলতে উদ্যোগ নিতে হবে।’
মিঠামইন হাওরের নামকরা প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, রিসোর্টে রক্ষণাবেক্ষণে যে খরচ তাও তারা তুলতে পারছেন না।
হাওরে পর্যটক না আসার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও প্রশাসন।

দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, হাওরে নৌকাডুবি প্রভৃতি বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছেন তারা।
ইটনা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাফিসা আক্তার বলেন, ‘অসাবধানতাবশত নৌক ডুবে শিক্ষার্থীসহ কিছু মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণে হাওরে ভ্রমনকারীদের সংখ্যা কমে গেছে বলে ধারণ করা হচ্ছে। এসব খবর গণমাধ্যমে এসেছে। তাছাড়া হাওরে সবকিছুর দাম বেশি নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করেন কিশোরগঞ্জের সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য আইনজীবী নাসির উদ্দীন ফারুকী।
তিনি বলেন, হাওরে বেশি আসে নিম্নবিত্ত-গরিব মানুষ। দেশে চাল, ডাল, আটা, ময়দাসহ সকল নিত্যপণ্যে দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের পকেটে টান পড়েছে। নৌকাডুবির কারণে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তরা হাওরকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে সমুদ্রসৈকতসহ অন্যান্য এলাকায় ছুটছেন। তাদেরকে হাওরে আনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রচারণাসহ সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
মিঠামইন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আছিয়া আলম মনে করেন, হাওরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার পাশাপাশি খাবারের দামও অধিকহারে নিয়েছেন পর্যটনজীবীরা। ফলে হাওরে ভ্রমণকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি এসব বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
পর্যটকদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন ইটনা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী কামরুল হাসান। তিনি পর্যটনজীবীদের পেশাদারত্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রবা/টিকে