লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৩ ১২:৫৬ পিএম
আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৩ ১৬:০৯ পিএম
কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা। আকস্মিক এ বন্যার পানি নামছে ধীরগতিতে। তবে এখনো পানিতে তলিয়ে আছে কৃষকের সিংহভাগ ক্ষেতখামার। বন্যায় উপজেলায় প্রায় দুই হাজার মাটির বসতঘর সম্পূর্ণ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্রোতে তোড়ে ভেঙে গেছে খালের পাড় ও সড়ক। ডুবেছিল অসংখ্য পুকুরসহ মাছ ও পোল্ট্রি খামার। এখন পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার ক্ষত।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্যায় আমিরাবাদ ইউনিয়নে প্রায় পাঁচশ মাটির বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পানি নামার পর ইউনিয়নের সিংহভাগ সড়কের এখন নাজুক অবস্থা। এদিকে ডলু ও টংকাবতী খালে প্রায় ১৫টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ এলাকার দুই শতাধিক পুকুর ও মাছের খামার এবং ১০টি পোল্ট্রি খামার পানিতে ডুবে গেছে।
চুনতিতে বিধ্বস্ত ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত সাড়ে পাঁচশ বসতঘর। এ ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি স্থানে রাস্তা ও খালের পাড় ভেঙে গেছে। প্রায় দেড়শ পুকুর ও মাছের খামার এবং দশটি পোল্ট্রি খামার পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়া সদর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনশর মতো ঘরবাড়ি। ইউনিয়নের সুখছড়ি খালের চার স্থানেসহ প্রায় দশ কিলোমিটার সড়ক ভেঙে গেছে।
এছাড়া বানের পানিতে বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আধুনগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পদ্মাবিলে অবস্থিত থ্রীষ্টার মুড়ির মিলের প্রায় ২০ লাখ টাকার চাল এবং ১০ লাখ টাকার মতো ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে।

মিল ম্যানেজার মাহামুদুর রহমান ভুট্টো বলেন, ‘বন্যায় আমার সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ টাকার মতো ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ২৫ জন কর্মচারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। মিল চালাতে না পারার কারণে তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ সম্মানিও দিতে পারছি না। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
লোহাগাড়া সদরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘরের মালিক মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘জীবনে বন্যায় এতো পানি হবে কল্পনা করিনি। পানিতে বাবার আমলের প্রায় ৬০ বছরের পুরাতন বসতঘরটি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আমি একজন ক্ষুদ্র দোকানদার। যা আয় করি তাতে পরিবারের ভরণপোষণ বহন করাও কষ্ট হয়ে পড়ে। আমার পরিবারে আমি উপার্জন করার মতো কেউ। আমার পরিবারে দুই কন্যা সন্তান আছে। এমতাবস্থায় আমার নতুন ঘর করা অসম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
পুটিবিলার কৃষক দিদারুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তিনি ৪৫ শতক জমিতে মরিচ ও ১২ শতক জমিতে টমেটো চারা রোপণ করেছেন। এতে তার প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সবেমাত্র গাছে মরিচ ধরা শুরু করেছে। বন্যার পানি সরে গেলেও গাছগুলো মরে যেতে শুরু করেছে। এছাড়া টমেটো ক্ষেত এখনো পানির নিচে রয়েছে। বন্যায় তার ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
অপরদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আধুনগরে অন্তত দুশ, বড়হাতিয়ায় শতাধিক, পুটিবিলায় অর্ধশত মাটির বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় কয়েকশ পুকুর, খামার, বহু সড়ক বিধ্বস্ত হয়েছে। একইভাবে চরম্বা, পদুয়া, কলাউজানেও শত শত বসতঘর, পুকুর, পোল্ট্রি খামার, কয়েক কিলোমিটার সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় এখনও অধিকাংশ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে আছে।
এসব এলাকার বাসিন্দারা বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে বন্যায় পানিবন্দি হয়ে তারা যে দুর্ভোগে পড়েছিলেন, পানি নামার পর তাদের এ দুর্ভোগ আরও কয়েকগুণ বেড়েছে। বিধ্বস্ত বাড়িঘর মেরামত করা, খাওয়ার বন্দোবস্ত করা, এরই মধ্যে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট- সব মিলিয়ে বিরাট এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তারা। এসব কাটিয়ে উঠতে তারা প্রশাসনের সহযোগিতা চাচ্ছেন।

উপজেলায় সব মিলিয়ে কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে- জানতে চাইলে লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কাজী শফিউল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বন্যার পানি সম্পূর্ণ নেমে গেলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যাবে।
এদিকে, পোল্ট্রি ও গবাদি পশুর খামারের ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে জানতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
লোহাগাড়া নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য উপজেলার সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে।