রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৩ ১৬:০১ পিএম
‘মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কিনত। প্রতি ঈদে টিকিটের জন্য ধাক্কাধাক্কি, মারামারি, কখনও কালোবাজারিদের কাছ থেকে বেশি দামে টিকিট সংগ্রহ করত। এই দৃশ্য ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের। এখন হল আছেÑ তবে কোনো ছবি আসে না। মাইকিং হয় না শহরের রাস্তায় রাস্তায়। দেয়ালে কিংবা হাটবাজারের দোকানের শাটারে সাঁটানো হয় না পোস্টার। দৈনিক পত্রিকায় নেই মুক্তির অপেক্ষায় থাকা কিংবা চলমান সিনেমার বিজ্ঞাপন।’ কথাগুলো বলছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের বলাকা সিনেমা হলের মালিক মির্জা ফয়সাল আমিন।
ঠাকুরগাঁও সার্কিট হাউজের পাশেই বলাকা সিনেমা হল। একসময়ের জমজমাট এই সিনেমা হলের একাংশ এখন ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সামনের দেয়ালে সিনেমার পোস্টারের বদলে ঝুলছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যানার। বাকি অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে গোডাউন হিসেবে।
ফয়সাল আমিন জানান, ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলটি শুরু থেকেই জনপ্রিয় ছিল। প্রতিদিন চারটি শো চলত। ছিল উপচে পড়া ভিড়। দর্শককে জায়গা দেওয়া যেত না। সেসব এখন সোনালি অতীত। সিনেমা হল বন্ধের কারণ ভালো ছবি না আসা। এ ছাড়া ডিশলাইন হয়েছে প্রতিটি বাড়িতে। ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনে সব দেখা যায়। ধীরে ধীরে মানুষ সিনেমা হলে আসা বন্ধ করে দেয়। লোকসানের মুখে তিন বছর আগে বন্ধ করে দেওয়া হয় হলটি।
শুধু বলাকাই নয়, জেলার সব সিনেমা হলই বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের ঠাকুরগাঁও রোডের মৌসুমী সিনেমা হলের মালিক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘একসময় বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না, রূপবান, খায়রুন সুন্দরী, কিরনমালাÑ এসব ছবি দেখার জন্য দর্শকরা মিনিবাস, ট্রাক্টর, পিকআপ বা ভ্যান ভাড়া করে হলে আসত। টিকিট পাওয়া নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। জেলার সব কটি সিনেমা হল সারা বছরই থাকত জমজমাট। কয়েক বছর ধরে হলে দর্শক নেই। কর্মচারীর বেতন দিতে পারি না। তাই লোকসানের মুখে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সব হলমালিকেরই একই অবস্থা।’
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সিনেমা হল সচল রাখতে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল সরকার। কিন্তু সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। সরকারের সহযোগিতা, মানসম্মত ছবি ও আধুনিকায়ন করলে আবার আগের দিন আসবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।
সাংস্কৃতিক কর্মী প্রফুল্ল কুমার রায় বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি সিনেমা হলই ছিল জমজমাট। দর্শকদের সামাল দিতে হল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হতো। টিকিট পাওয়া নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। সেসব এখন শুধুই ইতিহাস।
জেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক রেজওয়ানুল হক রিজু বলেন, হলগুলোকে পুরোনো রূপে ফিরিয়ে আনতে ভালো মানের সিনেমা বানাতে হবে। যাতে দর্শকরা আবারও হলমুখী হয়। এজন্য সরকারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘আমরা চাই আবারও সিনেমা হল চালু হোক। হলমালিকদের ঋণের প্রয়োজন হলে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। বন্ধ থাকা সিনেমা হলগুলো চালু হলে সুস্থ সংস্কৃতি ফিরে আসবে।’