মোহন আখন্দ, বগুড়া
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৩ ১৬:৩০ পিএম
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৩ ১৮:২৩ পিএম
মঞ্জুরুল আলম মোহন।
বগুড়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’ খ্যাত প্রভাবশালী নেতা ও জেলায় দলটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন হঠাৎই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
অথচ কিছুদিন আগেও দলের যেকোনো কর্মসূচিতে যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের শত শত নেতাকর্মী ও অনুসারীদের নিয়ে তিনি উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু অজানা কারণে এখন সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ডেই তাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ কামালের জন্মদিন উপলক্ষে গত ৫ আগস্ট জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আয়োজিত আলোচনা সভা এবং দোয়া মাহফিলেও সর্বশেষ মঞ্জুরুল আলম মোহনকে দেখা যায়নি। তার এক দিন আগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সভাতেও তিনি যথারীতি অনুপস্থিত ছিলেন।
সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে নামা বিএনপিসহ বিরোধী দলকে মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন সর্বস্তরের নেতাকর্মীদেরকে রাজপথে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তখন মঞ্জুরুল আলম মোহনের এমন নিষ্ক্রিয়তা দলের অভ্যন্তরে নানা আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দলের অনেকে তার এই নিষ্ক্রিয়তাকে রীতিমতো সন্দেহের চোখে দেখছেন।
তাদের ভাষ্য, দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার মতো সিনিয়র নেতার অনুপস্থিতি দলের জন্য যে ক্ষতিকর সেটা তিনি ভালোভাবেই জানেন। কিন্তু তারপরও দূরে সরে থাকছেন। অর্থাৎ তিনি আওয়ামী লীগের ক্ষতিই চাইছেন।
তবে ঘনিষ্ঠজনরা দাবি করেছেন, দলকে সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে নয়, বরং দলে নানাভাবে বঞ্চনার শিকার মঞ্জুরুল আলম মোহন প্রচণ্ড অভিমান থেকে নিজেকে আপাতত গুটিয়ে নিয়েছেন। সময় হলে আবার স্বরূপে আবির্ভূত হবেন। জানতে চাইলে মঞ্জুরুল আলম মোহন তার হঠাৎ নিষ্ক্রিয়তার কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তবে এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি কিছুটা আক্ষেপের সূরে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দলীয় কর্মসূচিগুলোতে আমাকে ডাকা হয় না’।
জানা গেছে, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের পর বগুড়ায় সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া ছাত্রলীগকে এগিয়ে নিতে যে ক’জন তরুণ সে সময় উদ্যমী হয়েছিলেন, তাদের অন্যতম মঞ্জুরুল আলম মোহন। প্রায় ১৪ বছর ছাত্রলীগ এবং পরে আরও ২৩ বছর যুবলীগে নেতৃত্ব দেওয়া মঞ্জুরুল আলম মোহন ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের বগুড়া জেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্রলীগ ও যুবলীগে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ওই দুই সংগঠনে তিনি শত শত কর্মী-সমর্থক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের কাছে মঞ্জুরুল আলম মোহন ছিলেন ‘হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা’।
১৯৯১ সালে ছাত্রলীগ ছেড়ে আসার পরও সংগঠনটির বড় একটি অংশ তিনিই নিয়ন্ত্রণ করতেন। যে কারণে বগুড়ায় ছাত্রলীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকÑ এ দুই পদের যেকোনো একটিতে মঞ্জুরুল আলম মোহনের কোনো-না কোনো অনুসারীকে রাখা রীতিমতো রেওয়াজে পরিণত হয়। একইভাবে ২০১৪ সালে যুবলীগ ছেড়ে এলেও বগুড়ায় ওই সংগঠনটির পুরো নিয়ন্ত্রণ কার্যত তার হাতেই থেকে যায়।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, মঞ্জুরুল আলম মোহন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতৃত্বে যতটা সফল হয়েছিলেন, আওয়ামী লীগে এসে ততটা সুবিধা করতে পারছেন না। যে কারণে ২০১৯ সালে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদেও একজন শক্ত দাবিদার হয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত তা অর্জন করতে পারেননি। ঠিক তার তিন বছরের মাথায় ছাত্রলীগের ওপর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেলেন তিনি।
২০২২ সালের ৭ নভেম্বর বগুড়ায় ছাত্রলীগের যে কমিটি ঘোষণা করা হয়, তাতে দেখা যায় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদে মঞ্জুরুল আলম মোহনের কোনো অনুসারীকেই রাখা হয়নি। একইভাবে বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণও তার হাতছাড়া হয়ে যায়। এমনকি তার পক্ষে আইনি সহায়তা দিতে গিয়ে মাহবুব আলম শাহীন নামে এক পরিবহন ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ওই ঘটনার রেশ কাটতে-না কাটতেই দুর্নীতি দমন কমিশন মঞ্জুরুল আলম মোহনের বিরুদ্ধে মামলা করে বসে। অবৈধভাবে প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি দায়ের করা মামলাটির তদন্ত দুদক এখনও শেষ করতে পারেনি।
সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিনের ‘রীতি’ অনুযায়ী জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে নিজের কোনো অনুসারীকে না রাখা এবং মোটর মালিক গ্রুপের নেতৃত্ব ফিরিয়ে না দেওয়ার ঘটনায় মঞ্জুরুল আলম মোহন প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছেন।
মঞ্জুরুল আলম মোহনের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তার একজন অনুসারীকে বগুড়া ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে বসানো হবেÑ এমন প্রতিশ্রুতি কেন্দ্র থেকেই তাকে দেওয়া হয়েছিল। আর মোটর মালিক গ্রুপে শাসক দলের অপর পক্ষের ‘অন্যায্য হস্তক্ষেপের’ বিষয়ে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের কাছে বিচার চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব দাবিদাওয়া উপেক্ষিত হওয়ায় মঞ্জুরুল আলম মোহন নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে দলের প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপুর পক্ষে প্রথমদিকে প্রচার-প্রচারণায় মঞ্জুরুল আলম মোহন ও তার অনুসারীদের মাঠে দেখা যায়নি। পরে অবশ্য কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে তাকে নৌকার প্রচার মিছিলে শরিক হতে দেখা গেছে। কিন্তু ওই নির্বাচনের পর থেকে দলের কোনো কর্মকাণ্ডেই আর তাকে দেখা যাচ্ছে না।
দলীয় কর্মকাণ্ডে হঠাৎ নিষ্ক্রিয়তার কারণ জানতে চাইলে মঞ্জুরুল আলম মোহন বলেন, ‘আমাকে ডাকা হয় না।’ ছাত্রলীগের কমিটি গঠন এবং মোটর মালিক গ্রুপ নিয়ে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘কোন প্রক্রিয়ায় ছাত্রলীগের কমিটি হয়েছে সেটি সবাই জানে। আর মোটর মালিক গ্রুপের বিষয়ে জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু বিচার পাইনি।’
তবে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু বলেন, ‘মঞ্জুরুল আলম মোহন কেন দলীয় কর্মসূচিগুলোতে আসছেন না, সেটা আমার জানা নেই। দলের সব কর্মসূচি সবাইকেই অবহিত করা হয়। সেখানে ডাকার প্রশ্ন আসবে কেন?’
ছাত্রলীগ এবং মোটর মালিক গ্রুপের নেতৃত্ব নিয়ে মঞ্জুরুল আলম মোহনের আক্ষেপ প্রসঙ্গে মজিবর রহমান মজনু বলেন, ‘এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা এর আগে বহুবার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের ব্যাপারে আমাদের কোনো করণীয় নেই। আর মোটর মালিক গ্রুপ নিয়ে দুইপক্ষে মামলা আছে। সেখানে আমাদের কোনো কিছু করার নেই।’