জয়ন্ত শাহা
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২২ ২০:৩০ পিএম
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২২ ২১:১৭ পিএম
ফাইল ফটো। সংগৃহীত
অসত্য-অমাঙ্গলিক কর্মকাণ্ড বর্জন করে সত্য ও কুশল কর্মপন্থা বরণ করে নেওয়ার প্রতিজ্ঞায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা রবিবার (৯ সেপ্টেম্বর) উদযাপন করবেন তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা।
প্রবারণা পূর্ণিমার অপর নাম ‘আশ্বিনী পূর্ণিমা’। প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাব্রত পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এ পূর্ণিমা তিথি সব বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর কাছে তাৎপর্যপূর্ণ।
রবিবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহার ও বাসাবোর ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহারে দিনভর রয়েছে নানা আয়োজন। ভোরে বিহারে অবস্থান করা ভিক্ষু সংঘের প্রভাতি পিণ্ডদানের পর বুদ্ধপূজা হবে। এরপর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের শীল গ্রহণ, অষ্টপরিষ্কারসহ মহাসংঘদানের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে দেশের সব বিহারে। এ সময় সম্মিলিত প্রার্থনায় অংশ নেবেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা।
প্রবারণা পূর্ণিমা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গৌতম অরিন্দম বড়ুয়া সেলু বলেন, প্রবারণা পূর্ণিমার দিন তাদের অন্যতম প্রধান আনন্দঘন ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা। এ পূর্ণিমায় তিন মাসব্যাপী তথাগত বুদ্ধ তাবতিংশ স্বর্গে মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনার পর বাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন। এদিনে ভিক্ষুসাদেকে তা হিত, সুখ, কলাম, ও প্রসারে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন এবং এই পূর্ণিমা তিথিতেই ত্রৈমাসিক বর্ষাবাসের পরিসমাপ্তি হয়। এ তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত দিবসটি তারা প্রতিবছরই সাড়ম্বরে উদযাপন করেন।
মেরুল বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ধর্মমিত্র মহাথের বলেন, ‘প্রবারণা শব্দটি সংস্কৃত থেকে আগত। শব্দটির পালি ভাষারূপ পবারণা। এর অর্থ প্রকৃষ্টরূপে বরণ করা। বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিন মাস বর্ষাব্রত পালন করেন। এই তিন মাস তারা বিহারে অবস্থান করেন। যেহেতু একসঙ্গে বসবাস করতে গেলে পরস্পরের মধ্যে ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক, সেহেতু ভিক্ষুদের মধ্যেও ভুলভ্রান্তি হতে পারে। তাই বর্ষাব্রত পালন শেষে ভিক্ষুগণ আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা করেন।’
তিনি বলেন, ‘ব্যাপক অর্থে প্রবারণা বলতে অসত্য ও অকুশল কর্মকে বর্জন করে সত্য ও কুশল কর্মকে বরণ করা। এ দিনে ভিক্ষুগণ পরস্পরের কাছে তাদের পূর্বকৃত ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যার মাধ্যমে বুদ্ধের শাসনের উৎকর্ষ ও ভিক্ষুসংঘের কল্যাণ সাধন হয়। ভিক্ষুসংঘের বর্ষাবাস পরিসমাপ্তির এই পবিত্র দিনকে কেন্দ্র করেই প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করা হয়। প্রবারণা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য একটি আবশ্যক বিধিবদ্ধ নিয়ম।’
প্রবারণা উদযাপনের ইতিহাস
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, শ্রাবস্তীর জেতবনে একসময় ভগবান বুদ্ধ অবস্থান করছিলেন। সেই সময় বিপুল সংখ্যক প্রগাঢ় মিত্রভাবাপন্ন ভিক্ষু কোশল রাজ্যের এক আবাসে বর্ষাবাসে রত ছিলেন। ভিক্ষুরা শঙ্কিত ছিলেন এই ভেবে যে, যদি তারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে হয়তো তাদের ধ্যান-সাধনার পথে বাধার সৃষ্টি হবে। এজন্য কেউ কারও সঙ্গে কোনো প্রকার বাক্য বিনিময় না করেই মৌনভাবে বর্ষাবাস পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বর্ষাবাস সমাপ্ত হলে মহামানব গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুদের কাছে তাদের বর্ষাবাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ বলেন, তারা নিজেদের মধ্যে কোনোরূপ কথা না বলে মৌনভাবে বর্ষাবাস অতিক্রান্ত করেছেন। ভিক্ষুগণের এমন উত্তরে বুদ্ধ অসন্তুষ্ট হন। কারণ একসঙ্গে বসবাস করতে গেলে নিজেদের মধ্যে ভুলত্রুটি কিংবা মতানৈক্য হওয়া স্বাভাবিক। তাই বলে ভিক্ষুগণ মৌনব্রত পালন করতে পারেন না। বুদ্ধ ভিক্ষুদের আদেশ প্রদান করলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, আমি অনুজ্ঞা প্রদান করছি—বর্ষাবাসিক ভিক্ষুগণ দৃষ্ট, শ্রুত অথবা আশঙ্কিত ত্রুটি বিষয়ে প্রবারণা করবে। ’
বুদ্ধ প্রবারণাকে ভিক্ষুদের জন্য পরস্পরের মধ্যে সংঘটিত অপরাধ থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় এবং অবশ্য পালনীয় নিয়ম হিসেবে নির্দেশ করেছেন।
বৌদ্ধরা মনে করেন, একে অন্যের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে যে অনন্য দৃষ্টান্ত প্রবারণা পূর্ণিমা শিক্ষা দেয়, তা শুধু ভিক্ষুসংঘের জন্য নয়, বরং সব মানবজাতির জন্য অনুকরণীয়। কারণ এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সম্প্রীতির শিক্ষা।
প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন থেকে পরবর্তী এক মাস অর্থাৎ কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত কঠিন চীবর দান সম্পন্ন হয়ে থাকে। বর্ষাবাস সমাপ্তকারী ভিক্ষুরা কঠিন চীবর গ্রহণ করেন।
প্রবারণা পূর্ণিমার এই পবিত্র দিনের আকর্ষণীয় একটি দিক হলো সন্ধ্যায় ফানুস ওড়ানোর উৎসব।
ফানুস মূলত ওড়ানো হয় বুদ্ধের কেশ ধাতুর প্রতি পূজা ও সম্মান প্রদর্শন করতে।
কথিত আছে, গৌতম বুদ্ধ গৃহ ত্যাগ করার পর ভাবলেন, তার কেশরাশি সন্ন্যাস যাত্রার পথে অন্তরায়। তাই তিনি চুলের কয়েক গাছি কেটে রাজমুকুটসহ ঊর্ধ্বাকাশে নিক্ষেপ করেছিলেন। তাবতিংশ স্বর্গের দেবতারা তার কেশরাশি নিয়ে চুলমনি চৈত্য প্রতিষ্ঠা করে পূজা করতে লাগলেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই সশ্রদ্ধচিত্তে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উড়িয়ে থাকেন।
গৌতম অরিন্দম বড়ুয়া সেলু জানান, রবিবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের অধিকাংশ বিহারেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফানুস ওড়াবেন।
মেরুলের আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে নানা আয়োজন
রবিবার বিকালে মেরুলের আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে আলোচনা সভার আয়োজন করছে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিশেষ অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ্য ধর্মমিত্র মহাথের। স্বাগত বক্তব্য দেবে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সভাপতি দিব্যেন্দু বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় মহাথেরও বক্তব্য দেবেন।
এদিন বিকালে ‘প্রবারণা পূর্ণিমার তাৎপর্য ও বিশ্বশান্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন।
খাগড়াছড়ির ধর্মপুর আর্য বনবিহার, সিবলী বৌদ্ধবিহার, মিলনপুর বৌদ্ধবিহার, বৈ-জয়ন্তী বৌদ্ধবিহার, পানখাইয়া পাড়া ধর্মরাজিক বৌদ্ধবিহারে যথাযথ বিধি মেনে প্রবারণা পূর্ণিমা পালিত হবে।
প্রবা/টিকে/এমআই