রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৩ ১৩:৩৫ পিএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৩ ১৫:০০ পিএম
কুড়িগ্রামে আই ফার্মার লিমিটেডের কাছে অনেকে গরু নিলেও লোকসানের মুখে এখন গরু শূন্য খামার। প্রবা ফটো
দেশের সর্বোচ্চ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করা জেলা কুড়িগ্রাম। চলতি বছরে এ পর্যন্ত ধরলা ও তিস্তা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব তিন শতাধিক পরিবার। এরই মধ্যে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে ঋণ নিয়ে দিশেহারা সহস্রাধিক কৃষক, খামারি ও কৃষি উদ্যোক্তা।
ঋণ পরিশোধ করেও মামলার হুমকি এবং ঋণ গ্রহণকালে দেওয়া জমির দলিল, ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প না পেয়ে এনজিওটির হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। এরই মধ্যে আই ফার্মার লিমিটেড নামে ওই প্রতিষ্ঠানটির হয়রানি থেকে বাঁচতে জেলা প্রশাসকসহ এনজি ব্যুরো বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।
তিস্তা নদীর প্রবল ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের সরিষাবাড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, যেখানে ছিল প্রায় ৩ হাজার মানুষের বসবাস। মাথা গোঁজার শেষ সম্বল ভিটেমাটি এখন তিস্তার গর্ভে। সব হারিয়ে বাকরুদ্ধ এসব মানুষ। একই চিত্র ধরলা নদীর ভাঙনে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের। ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে এসব পরিবার দ্বারস্থ হয় আই ফার্মার লিমিটেডের কাছে। এরই সুযোগ নিয়ে জমির মূল দলিল, ফাঁকা স্ট্যাম্প এবং ব্যাংকের ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে বর্গা পদ্ধতিতে তিস্তা ও ধরলা পাড়ের সহস্রাধিক ক্ষুদ্র কৃষক, খামারি ও উদ্যোক্তার মধ্যে কাউকে গরু, ব্রয়লার মুরগি, হাঁস, মাছ, বাদাম, আলু, পটল, বেগুন ও ধান চাষের ওপর লাভ-লোকসানের সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ঋণ দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ইতোমধ্যে শতাধিক ব্যক্তি সেই অর্থ পরিশোধ করেন। কিন্তু চরাঞ্চলের বেশিরভাগ ক্ষুদ্র কৃষক, খামারি ও উদ্যোক্তা দফায় দফায় বন্যা, নদীভাঙন ও করোনার সময়ে সব হারিয়ে পথে বসে। লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারগুলো। এমন পরিস্থিতিতে আই ফার্মার লিমিটেড তাদের বেঁধে দেওয়া শর্ত ভঙ্গের অজুহাতে রাজারহাট এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধে আইনি নোটিস ও মামলার আশ্রয় নেয়। ফলে অনেকেই এখন আই ফার্মার ফাঁদে পড়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হয়ে ফেরারি জীবনযাপন করছেন।
ঋণগ্রহীতা রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা গতিয়াশাম এলাকার বদরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়িঘর তিস্তা নদীর গর্ভে বিলীন হওয়ায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। স্বাবলম্বী হতে বর্গা পদ্ধতিতে ৩ লাখ টাকার গরু কিনে দেয় আই ফার্মার। লাম্পি স্কিনে একটি গরু মারা যায়। পরে ১ লাখ ৯৮ হাজার টাকায় বাকি গরুগুলো বিক্রি করে আই ফার্মারকে দিলে তারা ২০ শতাংশ সুদ দাবি করে। আমি তা দিতে অস্বীকার করায় আই ফার্মারের মাঠকর্মী সাইদুল আমাকে মামলার হুমকি দিচ্ছে এবং ঋণের সময় নেওয়া জমির দলিল, ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্প কিছুই দিচ্ছে না।’
কুড়িগ্রামের ত্রিমোহনী হরিশ্বর এলাকার খামারি মেহেদি হাসান মিলন বলেন, ‘স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দ্বারস্থ হই আই ফার্মারের কাছে। ৬ লাখ টাকায় ৭টি গরু কিনে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। লাম্পি স্কিন ও মহামারি করোনায় পানির দরে সব গরু বিক্রি করে দিই। আই ফার্মার লাভ-লোকসানের দায়ভার নেওয়ার কথা বললেও তা তারা করেনি। ২০ শতাংশ সুদ দিয়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা লোকসানে পড়ে এখন আমি পুরোপুরি নিঃস্ব।’
সদর উপজেলার মোগলবাসা ইউনিয়নের উদ্যোক্তা ফারুক মণ্ডল বলেন, ‘আই ফার্মার বর্গার শর্তে লাভের অংশ নেবে মর্মে ৫ লাখ টাকার গরু কিনে দেয়।। কিন্তু লাম্পি স্কিনে গরুগুলো পানির দরে বিক্রি করে আই ফার্মারের ফিল্ড ফ্যাসিলেটর রাসেল রহমানকে দিই। পরে তারা ২০ শতাংশ সুদ দাবি করে। আমি তা দিতে অস্বীকার করায় আমার নামে মামলা করেছে। বর্গার কথা বললেও আই ফার্মার আমার মতো অনেক মানুষকে ফাঁদে ফেলে জোর করে ২০ শতাংশ সুদ আদায় করছে। ডিসি অফিসে অভিযোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো উপকার পাই নাই।’
এ বিষয়ে আই ফার্মার লিমিটেডের কুড়িগ্রাম মার্কেট ফ্যাসিলেটর রাসেল রহমান বলেন, ‘আই ফার্মার আমাকে চাকরি দেওয়ার সময় ফাঁকা চেক নিয়েছে এবং নানান শর্ত দিয়েছে। যার কারণে আমরা যারা মাঠপর্যায়ে কাজ করি তারাও কৃষক, খামারি ও উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ফাঁকা স্ট্যাম্প, ফাঁকা চেক এবং জমির মূল দলিল নিয়ে থাকি। ঋণের টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মাঠপর্যায়ের সুফলভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে আই ফার্মার লিমিটেডের হেড অব অপারেশন জুলফিকার ফরহাদ রাফেল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা কৃষক, খামারি ও উদ্যোক্তা তৈরির কাজ করছি। প্রতিটি এনজিও সুদ নিয়ে থাকে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আইনি পদক্ষেপ তো নিতেই হবে। তবে মামলা করার জন্য আমাদের ওপর কোনো নির্দেশনা নেই।’ নিউজ করলে প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় ক্ষতি হবে জানিয়ে এই প্রতিবেদককে নিউজটি না করার আহ্বান জানান তিনি।
এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আই ফার্মার লিমিটেডের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আমরা ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছি। দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) বিষয়টি দেখার জন্য বলা হয়েছে। বর্গার কথা বলে ২০ শতাংশ সুদ গ্রহণের প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা হবে।’